আন্তর্জাতিক
হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রস্তাবে আজ নিরাপত্তা পরিষদে ভোট

ইরানের হামলা থেকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের সুরক্ষায় ‘প্রতিরক্ষামূলক’ সামরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন দিতে একটি খসড়া প্রস্তাবের ওপর আজ শুক্রবার ভোট দেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে বাহরাইন। এতে বলা হয়েছে, ইরানের হামলার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে চলমান এক মাসের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
জাতিসংঘে বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত জামাল আলরোয়াইয়ি এ সপ্তাহে বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ মেনে নিতে পারি না। এর প্রভাব শুধু আমাদের অঞ্চলে নয়, পুরো বিশ্বেই পড়ছে।’
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়া প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আনা হয়েছে এবং এতে একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেন, জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলো যেন হরমুজ প্রণালি থেকে ‘নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ করে’।
তিনি আরও জানান, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সহায়তা করবে না।
এএফপি’র দেখা ষষ্ঠ ও চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলো এককভাবে বা বহুজাতিক নৌ জোট গঠন করে ‘প্রয়োজনীয় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক সব ধরনের ব্যবস্থা’ নিতে পারবে।
এ ব্যবস্থা হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় প্রযোজ্য হবে। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অবরোধ বা বাধা প্রতিহত করা।
প্রস্তাবটি অন্তত ছয় মাস কার্যকর রাখার কথা বলা হয়েছে।
রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের সমর্থন পেতে খসড়ায় পরিমার্জন করা হয়েছে। সংশোধিত খসড়ায় সরাসরি জাতিসংঘ সনদের ‘অধ্যায় ৭’-এর কথা উল্লেখ করা হয়নি। এই অধ্যায় নিরাপত্তা পরিষদকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেয়।
আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা (১৫০০ জিএমটি) ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সর্বশেষ খসড়ায় যেকোনো হস্তক্ষেপকে স্পষ্টভাবে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ফ্রান্সের উদ্বেগ কিছুটা কমিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফন্ট বৃহস্পতিবার বলেন, মার্চে সদস্যরা হরমুজ প্রণালি অবরোধে ইরানের ভূমিকার নিন্দা জানানোর পর এখন প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নির্ধারণ করা পরিষদের দায়িত্ব।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে বলপ্রয়োগের বৈধতা দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।’
রাশিয়া ও চীন—উভয়েরই ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। তারা প্রস্তাবটি সমর্থন করবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই দেশের সম্ভাব্য ভেটোর কারণে প্রস্তাবটি পাস হওয়া অনিশ্চিত।
চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া মানে বেআইনি ও নির্বিচার শক্তি প্রয়োগকে বৈধতা দেওয়া। এতে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটবে এবং গুরুতর পরিণতি দেখা দিতে পারে।
তেহরানের দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়াও প্রস্তাবটিকে একতরফা আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ফোর্টি এএফপিকে বলেন, সম্ভাব্য রুশ ও চীনা ভেটোর কারণে প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কঠিন হতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল, গ্যাস ও সারসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে দামও বেড়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন খুবই বিরল ঘটনা।
১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় এক ভোটের মাধ্যমে কুয়েত আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটকে ইরাকে হস্তক্ষেপের অনুমতি দেওয়া হয়।
এছাড়া ২০১১ সালে একই ধরনের ভোটে লিবিয়ায় ন্যাটোর হস্তক্ষেপ অনুমোদিত হয়। এর ফলেই স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ঘটে।







