সাহিত্য

‘গুপ্ত’ শব্দের শিকড় ও বিবর্তনের ইতিবৃত্ত

বিশেষ প্রতিনিধি

শেয়ারঃ

‘গুপ্ত’ শব্দের শিকড় ও বিবর্তনের ইতিবৃত্ত- খবরের থাম্বনেইল ফটো

দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য

বাংলা ভাষার বিশাল শব্দভাণ্ডারে এমন কিছু শব্দ আছে যা একইসঙ্গে ইতিহাস, আভিজাত্য এবং রহস্যের ভার বহন করে। তেমনই একটি অতি পরিচিত শব্দ হলো ‘গুপ্ত’। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি সাধারণ পদবি বা বিশেষণ মনে হলেও, এর ব্যুৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের পথটি অত্যন্ত সুগভীর। বিশেষ করে সংস্কৃত ব্যাকরণ থেকে শুরু করে প্রাচীন ভারতের রাজবংশীয় ইতিহাস পর্যন্ত এই একটি শব্দের বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায়।


ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি বিশুদ্ধ তৎসম শব্দ। সংস্কৃত ‘গুপ্‌’ ধাতুর সাথে ‘ক্ত’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে এই শব্দের সৃষ্টি।ব্যাকরণগতভাবে এর মূল অর্থ হলো ‘রক্ষণ করা’ বা ‘গোপন রাখা’। অর্থাৎ, যা কিছু আড়াল করে রাখা হয়েছে কিংবা যা পরম যত্নে সুরক্ষিত, তাকেই ‘গুপ্ত’ বলা হয়। প্রাচীন পাণিনীয় ব্যাকরণ অনুসারে, এই ধাতুটি মূলত রক্ষা করা বা আড়াল করার মানসিকতা থেকে উদ্ভূত।


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শব্দটির গুরুত্ব অপরিসীম। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে যখন ভারতে ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই এই শব্দটি একটি রাজকীয় পরিচয়ে পরিণত হয়। শ্রীগুপ্ত থেকে শুরু করে চন্দ্রগুপ্ত বা সমুদ্রগুপ্তের শাসনামলে এই পদবিটি আক্ষরিক অর্থেই ‘প্রজাদের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, তৎকালীন রাজারা নিজেদের নামের শেষে ‘গুপ্ত’ যুক্ত করতেন মূলত নিজেদের শাসনের সুরক্ষা এবং দেবতার আশীর্বাদপুষ্ট আভিজাত্য বোঝাতে। পরবর্তীতে মধ্যযুগে এটি বর্ণপ্রথার কাঠামোর মধ্যে এসে বৈশ্য ও কায়স্থ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান পারিবারিক উপাধিতে রূপান্তরিত হয়।


তবে কেবল পদবিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই শব্দের ব্যবহার। বাংলা সাহিত্যে ও প্রাত্যহিক কথাবার্তায় এর প্রয়োগ বহুমুখী। রহস্যময় কোনো বিষয়কে যেমন আমরা ‘গুপ্ত’ বলে আখ্যা দেই, তেমনি আড়ালে থেকে তথ্য সংগ্রহকারীকে বলি ‘গুপ্তচর’। আবার মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অমূল্য রত্নকে ডাকি ‘গুপ্তধন’ নামে। তান্ত্রিক সাধনা বা আধ্যাত্মিক ধারায় ‘গুপ্ত’ শব্দটির গুরুত্ব আরও গভীর; সেখানে এটি নিগূঢ় বা অপ্রকাশ্য জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, আধুনিক ভাষাবিদদের অনেকে ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দমূলের সাথে এর সংযোগ খুঁজে পান। ইংরেজী ‘Keep’ বা ‘Cover’ শব্দের সাথে সংস্কৃত ‘গুপ্‌’ ধাতুর যে অর্থগত মিল, তা বিশ্বজনীন ভাষাতত্ত্বের এক চমৎকার নিদর্শন। আজ আমাদের দৈনন্দিন আলাপে শব্দটি সহজভাবে মিশে থাকলেও, এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতি আর আর্য সভ্যতার বিবর্তনের ছাপ। শব্দটির এই অন্তর্নিহিত ‘গোপন’ শক্তির কারণেই এটি আজও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি।


#......


সম্পর্কিত খবর