ক্যাম্পাস
শেকৃবিতে ফের পরীক্ষা স্থগিত, সেশনজটের শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কৃষি অনুষদের নির্ধারিত পরীক্ষা আবারও স্থগিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। পাল্টাপাল্টি আবেদন, প্রশাসনিক বৈঠক এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা স্থগিত হওয়াকে কেন্দ্র করে একাডেমিক শৃঙ্খলা ও পরীক্ষা পেছানোর সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলমান একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কৃষি অনুষদের লেভেল-৩, সেমিস্টার-২ এর ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল ২৯ মার্চ। তবে তা শুরু হয় প্রায় দুই মাস পরে, ১৭ মে। একইসঙ্গে ‘SOIL 303’ কোর্সের মিডটার্ম পরীক্ষাও একাধিকবার স্থগিত করা হয়। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ফাইনাল পরীক্ষা শুরুতে বিলম্ব ঘটে এবং পুরো একাডেমিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর দাবি জানালে কৃষি অনুষদের ডিন তাদের ব্যক্তিগতভাবে (ইন্ডিভিজুয়ালি) আবেদন জমা দিতে বলেন। পরে এক পক্ষের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে ব্যক্তিগত আবেদন জমা দেয়। অন্যদিকে আরেক পক্ষ পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার দাবিতে কৃষি অনুষদের ডিন ও উপ-উপাচার্য বরাবর আবেদন করে।
প্রথমদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরীক্ষা নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে কৃষি অনুষদের ডিন, উপ-উপাচার্য এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যানদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আর পরীক্ষা পেছানোর দাবি না করার বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে বারবার পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, ঘনঘন পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার কারণে একাডেমিক অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং সেশনজটের ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পর হঠাৎ পরীক্ষা স্থগিত হলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আজাদ বলেন, “করোনার কারণে এক বছরের সেশনজট নিয়েই আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠা। কিন্তু প্রায় প্রতি সেমিস্টারেই কোনো না কোনো পরীক্ষা পিছিয়েছে। প্রশাসন একাডেমিক রুটিন দিলেও তা অনেক সময় অনুসরণ করা হয় না।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীরা দাবি তুললেই পরীক্ষা পেছানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আমরা চাই এই অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক এবং নির্ধারিত সময়েই সেমিস্টার শেষ করা হোক।”
শিক্ষার্থীদের আরেক অংশ অবশ্য পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক বলছেন। তাদের মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় না পাওয়া এবং ঈদকে কেন্দ্র করে যাতায়াত সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি অনুষদের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের অনুষদে প্রায় ২০টি ল্যাব গ্রুপ রয়েছে। যাদের ল্যাব পরীক্ষা ১২ তারিখে শেষ হয়েছে, তারা পর্যাপ্ত প্রিপারেশন লিভ পায়নি। ফলে অনেকেই ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেনি।”
কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী নাহিদ মাহমুদ সৌরভ বলেন, “মূল সমস্যা ছিল টিকিট সংকট। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীরা বাড়ি যাওয়ার টিকিট পাচ্ছিল না। মেয়েদের জন্য বিষয়টি আরও জটিল ছিল নিরাপত্তার কারণে। তাই অনেকেই পরীক্ষা পেছানোর দাবি জানিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রশাসন প্রথমে পরীক্ষা স্থগিত করতে চায়নি। পরে প্রায় ২০০টির মতো ইন্ডিভিজুয়াল আবেদন জমা পড়ার পর শিক্ষার্থীদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়।”
কৃষি অনুষদের ডিন এ.এম.এম শামসুজ্জামান বলেন," শিক্ষার্থীদের মবের কাছে প্রশাসন অসহায়, গতকালকে আমার বাসায় পুরো একটা দিন শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছে, বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত। একটা ফ্যামালিতে এইভাবে বাসায় এসে যদি সবাই বসে থাকে তাহলে কি করা যেতে পারে। প্রোভিসির বাসায় পুরোটা সময় ওরা বসে ছিল । প্রোভিসি চাপে পড়ে শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে তিনবার সয়েল পরীক্ষা ক্যান্সেল এর বিষয়ে ডিন বলেন, তিনবার সয়েল পরীক্ষা ক্যান্সেল এর বিষয়টা পুরোটাই ইগোষ্টিক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রুপিং ছিল, এক গ্রুপ এর ডেট আরেক গ্রুপের পছন্দ হয়নি তাই ওরা ক্যান্সেল করছে। গতকালকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি পরীক্ষা ক্যান্সেল করার কালচার থেকে বেরুতে হবে, নাহলে এইটা একটা খারাপ উদাহরণ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. বেলাল হোসেন বলেন, উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে ১৯২টি ব্যক্তিগত আবেদন জমা পড়েছিল, বিপরীতে পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার পক্ষে আবেদন ছিল মাত্র ৬টি। তাই সার্বিক বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটি চাপের বিষয় নয়। যাতায়াতসহ বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভদের কাছ থেকে লিখিত নেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসন নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পরবর্তীতে আর পরীক্ষা পিছানো হবে না।
উল্লেখ্য, এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে একাধিক পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কৃষি ব্যবসা ব্যবস্থাপনা অনুষদের লেভেল-৩, সেমিস্টার-২ এর একটা কোর্সের মিড সেমিস্টার পরীক্ষা এবং লেভেল-২, সেমিস্টার-২ এর ‘Macroeconomics-II’ পরীক্ষাও পূর্বনির্ধারিত তারিখে অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়া কৃষি অনুষদের ‘Soil Physics and Soil Chemistry’ কোর্সের মিড সেমিস্টার পরীক্ষাও একাধিকবার স্থগিত হওয়ার ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।






