জাতীয়
‘তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, জরিপ শেষ হবে দ্রুতই’

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছেন তিস্তা নদীর স্থায়ী সমাধান এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন এ্যানী।
এছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করতে সম্ভ্যবতা জরিপ দ্রুত শেষ করা হবে বলে সম্প্রতি চীনে সরকারি সফর শেষে বেইজিং ত্যাগের আগে গণমাধ্যমের কাছে জানান পানি সম্পদ মন্ত্রী। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি সহযোগিতা ও পূর্ণ সমর্থন পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানান।
জাতীয় সংসদে এ্যানী বলেন, ‘নদীভাঙন, পানির সংকট এবং বন্যা—এই তিন সমস্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে দেশের লাখো মানুষ। তিস্তা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রসহ প্রায় চার হাজার কিলোমিটার নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘নদীভাঙনের শিকার মানুষ বাজেট বোঝে না, তারা শুধু বাঁচতে চায়। প্রতিটি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও নদীভাঙন হচ্ছে। এই মানুষের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
তিনি জানান, গত ১৯ জুলাই তিস্তা পাড় পরিদর্শনের আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে তিস্তা অববাহিকার মানুষের কাছে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরতে বলেন।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭ কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সরকার চলতি অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেবে। তিস্তা পাড়ের ২ কোটি মানুষকে আশ্বস্ত করে আসবেন— মহাপরিকল্পনা বা যে নামেই হোক, আমরা এই অর্থবছরেই এটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবো।’
পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে তিনি সফরসঙ্গী ছিলেন। সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় আইনসভা এবং সর্বশেষ চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তিস্তা প্রকল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট, যিনি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং এ বিষয়ে গ্রন্থও রচনা করেছেন, তিনি বাংলাদেশের তিস্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
মন্ত্রী বলেন, চীন সরকার শুধু তিস্তা প্রকল্প নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার উন্নয়নেও পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তিনি আরও জানান, চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা (টেকনিক্যাল সাপোর্ট) দিতে সম্মত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে এবং প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শুরু হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দ্রুত সমীক্ষা শেষ করে বিশ্বমানের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে আমরা বিশ্বমানের তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবো। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকার ইতোমধ্যে নিয়েছে এবং দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় ওই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
মন্ত্রী বলেন, পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত মাথাভাঙ্গা, ইছামতি, বারাসিয়া ও অন্যান্য নদী-খালের প্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, নৌ-যোগাযোগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, নদীভাঙন প্রতিরোধে গত চার মাসে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া সরকার দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে প্রয়োজনে এ কর্মসূচি ২৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, খাল পুনঃখনন শুধু পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করবে না; বরং সেচব্যবস্থা, গ্রামীণ যোগাযোগ, কৃষি উৎপাদন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করবে।
অন্যদিকে চীন শেষে গণমাধ্যমের কাছে মন্ত্রী বলেন, ‘তিস্তায় একটা ফিজিবিলিটি স্টাডির ব্যাপারে চীন সম্মত হয়েছে। আমরা যৌথভাবে স্টাডিটা কমপ্লিট করব।’
পানি সম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনায় অন্যান্য যে সকল নদী রয়েছে সেগুলোর জন্য আমরা তাদের থেকে সহযোগিতা চেয়েছি, অনেকগুলা নদীর সঙ্গে তাদের যে সম্পৃক্ততা সেগুলোও আমরা এডজাস্ট করব।’
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের কথা উল্লেখ করে এ্যানি বলেন, ‘তিস্তার ব্যাপারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কয়েকবার আলোচনা করেছেন। ইভেন চীনের প্রেসিডেন্টের সামনে, চীনের প্রধানমন্ত্রীর সামনে তিস্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘চীনের সাইডে সেখানকার ওয়াটার রিসোর্স মিনিস্টারসহ আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অন্যান্য মন্ত্রী এবং উপদেষ্টামন্ডলী ছিলেন। সেখানে ডেলিগেটস যারা ছিলেন, সবার মধ্যে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, তিস্তার জন্য আমাদের যে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা-চাওয়া, তিস্তা অববাহিকায় যেখানে আমাদের হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে দীর্ঘদিন থেকে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এর থেকে উত্তরণে আমাদেরকে একটা বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া খুব জরুরি। এ জন্য একটা টেকনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্স প্রয়োজন। সেখানে একটা ফিজিবিলিটি স্টাডি ব্যাপারে তারা (চীন) সম্মত হয়েছে।’
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই এই সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। তিনি তার জীবদ্দশায় দুইবার চীনে এসেছিলেন।
পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাতবার চীন সফর করেন জানিয়ে এ্যানী আরও বলেন, এর মধ্যদিয়ে সম্পর্কটা আরও বেশি গভীর হয়। ফলে চায়নার সঙ্গে বাংলাদেশের যে একটা ধারাবাহিক উন্নত সম্পর্ক, এটা তারা ফিল করে, আমরাও সেটাকে অত্যন্ত অনার করি।’







