আন্তর্জাতিক
ইরানে ১৭০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, নিহত ১৪

ছবি : সংগৃহীত
দুই দিনে ইরানে ১৭০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এসব হামলায় ১৪ জন নিহত ও ৭৮ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা প্রথমে মঙ্গলবার রাতে ৮০টি এবং দ্বিতীয় দফায় বুধবার রাতে ৯০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা।
এদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হোসেইন কেরমানপুর বলেছেন, ৮ ও ৯ই জুলাই ইরানের পাঁচটি প্রদেশে চালানো মার্কিন হামলায় আরও ৭৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা ইরানশাহরের গভর্নর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের একটি ভবনে মার্কিন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র তাদের দুটি রেলওয়ে ব্রিজ (যেমন আক্কালা এলাকার রেলসেতু) এবং বন্দরনগরী চাবাহারের একটি মেরিটাইম ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে আঘাত হেনেছে, যা বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর বড় আঘাত।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা কুয়েত, বাহরাইন এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
আইআরজিসির বিবৃতির বরাতে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি লঙ্ঘন করে বুধবার মধ্যরাতে দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাব দিতেই এই হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘মার্কিন চুক্তি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের প্রথম পর্যায় হিসেবে আইআরজিসির নৌ এবং অ্যারোস্পেস বাহিনীর যোদ্ধারা কুয়েতের আরিফান এবং আল-সালেম ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জাফাইর এবং শেখ ইসা ঘাঁটিতে একটি যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অপারেশন পরিচালনা করেছে। ইরানজুড়ে শত্রুপক্ষের হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।’
আইআরজিসি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘যদি শত্রুপক্ষ ফের এমন আগ্রাসন চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঘাঁটিগুলোতেও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং দেশটির শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আঘাত করলে পাল্টা আঘাত পেতে হবে এবং আমেরিকা এখনো বোঝেনি যে জোরজুলুম ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দিন শেষ’।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই ঐতিহাসিক ১৪ দফার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়া এবং বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেল ইরান। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিন উভয় পক্ষের জন্য এটি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে ইরানের সিরিক, বন্দর আব্বাস বন্দর, কেশম দ্বীপসহ প্রায় ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। পাল্টা জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত ৮৫টি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে তেহরান।
এর কয়েক ঘণ্টা পরই বুধবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ‘শেষ হয়ে গেছে’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এরপর থেকেই উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে একের পর এক পাল্টা আঘাত করে যাচ্ছে।
সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরাজ স্কিয়ার্স আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, গত মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতা স্মারকটি এখনো পুরোপুরি ভেস্তে যায়নি, তবে এটি অত্যন্ত নাজুক বা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
তার মতে, দুই পক্ষই মূলত তাদের মূল পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত চূড়ান্ত আলোচনায় নিজেদের দরকষাকষি ও অবস্থান শক্তিশালী করতে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে।







