আন্তর্জাতিক
ভেঙে ফেলা হচ্ছে কলকাতা বিমানবন্দরের ১৩৬ বছরের পুরনো মসজিদ

ছবি : সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক গৌরীপুর জামে মসজিদটি (বাঁকড়া মসজিদ) ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ভারতের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ (এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া) জানিয়েছে, বিমান চলাচল ও সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসন এবং মসজিদ কমিটির যৌথ সম্মতিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্থানান্তরের প্রাথমিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে আজ শনিবার (১১ জুলাই) থেকেই মসজিদটিতে নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয়দের কাছে ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামে পরিচিত মসজিদটি প্রায় ১৩৬ বছরের পুরোনো, যা ১৯২৪ সালে কলকাতা বিমানবন্দর (নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার আগেই সেখানে নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৬২ সালে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণের সময়ও মসজিদটি অক্ষত রাখা হয়।
তবে এটি নতুন করে নির্মিত বিমানবন্দরের দ্বিতীয় বা ছোট রানওয়ের মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে, উচ্চ-নিরাপত্তা বেষ্টনীর (লেভেল ৩) ভেতরে অবস্থিত, যা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী ন্যূনতম দূরত্ব ২৪০ মিটারের থেকে অনেক কম।
রানওয়ের খুব কাছে মসজিদটি থাকায় শীতকালে বা কম দৃশ্যমানতার সময় বড় বিমান ওঠানামায় সমস্যা হতো। এছাড়াও প্রধান রানওয়ে বন্ধ থাকলে দ্বিতীয় রানওয়েটি পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না। মসজিদটি সরানোর ফলে রানওয়ে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে, যা আগামী কয়েক দশকের জন্য বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়াবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এছাড়াও এতদিন স্থানীয় মুসল্লিদের কড়া নিরাপত্তা ও বিশেষ পাস চেকিংয়ের মাধ্যমে বাসে করে বিমানবন্দরের ভেতরে নামাজ পড়তে নিয়ে যাওয়া হতো। এটি বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল জায়গার জন্য বড় একটি লজিস্টিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ছিল।
বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, এই মসজিদের কারণে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজও থমকে আছে প্রায় ৩০ বছর। কখনও স্থানীয় বাধা, কখনও পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারের ঢিলেমিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়নি। তবে সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তিন দশকের পুরোনো জট কাটানো হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বছরের হজ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর ২০১৩ সালের আগের পুরোনো টার্মিনাল ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে। সেই জায়গায় দিল্লির আদলে একটি বিশ্বমানের ‘অ্যারোসিটি’ এবং আধুনিক টার্মিনাল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, বিমানবন্দরের সীমানার বাইরে আরও বড় পরিসরে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রেখে স্থানীয় বাসিন্দা ও মসজিদ কমিটির সর্বজনমতের ভিত্তিতেই এই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি অনুযায়ী, নামাজ পড়তে আসা সাধারণ মুসল্লিদের একটি বড় অংশ বিমানবন্দরের নিরাপত্তার স্বার্থে এই স্থানান্তরে সম্মতি জানিয়েছেন। জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের মতো কিছু ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা ও সমন্বয় করে পুরো প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
বিরোধী দল বা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যাতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে, সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
উত্তর দমদমের বিধায়ক সৌরভ শিকদার নিশ্চিত করেছেন, ‘বিমানবন্দর থানার কাছে থাকা একটি প্রাচীন মন্দিরও টার্মিনাল সম্প্রসারণের স্বার্থে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উন্নয়নের স্বার্থে কোনো ধর্মীয় কাঠামোর সঙ্গে আপস করা হবে না’।
প্রসঙ্গত, ভারতে মসজিদ ভাঙা বা উচ্ছেদ নিয়ে বিতর্কটি বর্তমানে দেশটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং বিরোধী দলগুলো একে পক্ষপাতমূলক উচ্ছেদ হিসেবে দাবি করছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার একে অবৈধ দখল উচ্ছেদ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। তবে বাঁকড়া মসজিদের বিষয়টি ভিন্ন বলেই মনে করা হচ্ছে।







