আন্তর্জাতিক
মাদুরোবিহীন ভেনেজুয়েলায় ভয় কমলেও দুর্ভোগ কমেনি

ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার আট মাস পর দেশটির মানুষের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি বিরাজ করছে।
তার পতনে স্বস্তি এলেও চলমান অর্থনৈতিক দুর্ভোগ নিয়ে এখন অধৈর্য হয়ে উঠছেন মানুষ। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের উদ্যোগ সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি এখনও সংকটের মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য অনিশ্চিত আয় ও আকাশছোঁয়া খাদ্যমূল্যই এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
কারাকাস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
মারবেলিস দালিজ ও তার স্বামী আরলিন্দো দা সিলভা একটি মিষ্টান্নের দোকান চালান। অতিমুদ্রাস্ফীতি ও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের ব্যবসার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ‘আমাদের অনেক প্রত্যাশা ও আনন্দ ছিল,’
দালিজএএফপিকে বলেন, পরবর্তী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আগেই কাজ শেষ করার তাড়ায় তিনি এক গ্রাহকের জন্য দ্রুত খাবার প্রস্তুত করছিলেন।
তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাস্তবতা আমাদের সব আশা ভেঙে দিয়েছে।’
৫৪ বছর বয়সী এই মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক অল্প মুনাফায় কোনোরকমে টিকে আছেন। ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন না তিনি।
অর্থনীতি একটি বিপর্যয়। ‘আশা করি, একসময় এই পরিস্থিতি কেটে যাবে এবং আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াব।’
মূল্যবৃদ্ধি ভেনেজুয়েলাবাসীকে ‘ধ্বংস করছে’-বলিভারের ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে ২০১৯ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি কার্যত ডলারনির্ভর হয়ে পড়েছে।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পর অনেকেই দেশে ডলারের প্রবাহ বাড়বে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু বলিভারে হিসাব করা বার্ষিক মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৫৭৫ শতাংশ।
মূল্যবৃদ্ধি ভেনেজুয়েলাবাসীকে ‘ধ্বংস করছে’ বলে মন্তব্য করেন অধিকারকর্মী জায়দা মুজিকা।
৬১ বছর বয়সী মুজিকা এএফপিকে বলেন, ‘নিকোলাস মাদুরোকে যখন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গেল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নিয়ে আমার অনেক আশা ছিল।’
তিনি বলেন, ‘তারা স্বৈরশাসককে সরিয়েছে, কিন্তু স্বৈরশাসনকে নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের জন্য উপকারী এমন কিছুই ঘটেনি।’
মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে কার্যত ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে সরকার পরিচালনা করছেন।
তিনি বিদেশি ও বেসরকারি পুঁজির জন্য বেশ কয়েকটি খাত উন্মুক্ত করেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইইএসএ) অধ্যাপক হোসে ম্যানুয়েল পুয়েন্তে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।’
তিনি বলেন, যতদিন ভেনেজুয়েলায় ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি’ থাকবে, ততদিন দেশটির সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।
মাদুরোকে আটকের খবর ৩ জানুয়ারি নিজ বাড়িতে উদযাপন করেছিলেন হাভিয়ের চাকন ও তার স্ত্রী দেলিয়া। মাদুরোর ১৩ বছরের শাসনামলে চলা দমন-পীড়নের কারণে তারা ভীত ছিলেন।
কারাকাসের ব্যস্ত কুইন্তা ক্রেসপো বাজারে এএফপিকে হাভিয়ের বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই, আমরা ভেবেছিলাম পরিবর্তন আসবে।’
৪৪ বছর বয়সী এই পোশাক প্রস্তুতকারক বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভেনেজুয়েলায় আমরা শুধু বেঁচে আছি।’
এরই মধ্যে ২৪ জুন এক মিনিটের ব্যবধানে উত্তর ভেনেজুয়েলায় দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।
এই দুর্যোগে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান। আহত হন আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ। ধ্বংস হয় কয়েক শত ভবন।
কারাকাসের একটি বাজারে পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী বিক্রি করেন ৪০ বছর বয়সী কারমেন রামিরেজ। ভূমিকম্পে তার বাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পিকআপ ভ্যানের পেছনে রাখা পণ্যগুলো গোছাতে গোছাতে রামিরেজ বলেন, ‘বেরিয়ে এসে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’
মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক দালিজ বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। মাদুরোর সময়ের তুলনায় এখন মানুষ কম ভয় পায়। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর ভিন্নমত দমনে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন মাদুরো।
বাতাসে সদ্য তৈরি খাবারের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে দালিজ বলেন, এটি উদযাপনের মতো একটি বিষয়।
তিনি বলেন, ‘আগে ইনস্টাগ্রামে রাজনীতি নিয়ে একটি পোস্ট দেওয়ার সাহসও আমার ছিল না।’
‘কিন্তু এখন দিই, এখন লিখি, ‘মাদুরো চলে গেছে, কী দারুণ!’
রদ্রিগেজ দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, রাজনৈতিক বন্দিদের স্বজন এবং এমনকি বামপন্থী কর্মীরাও নিজেদের অধিকারের দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে নির্বাচিত বিরোধী নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়ে আলোচনাতেও অংশ নিচ্ছে।
তবে সবাই যে আগের চেয়ে স্বস্তিতে আছেন, তা নয়।
৫৬ বছর বয়সী সাবেক রাজনৈতিক বন্দি জেরি ওস্তোস বলেন, সরকার ‘ভিন্ন মত পোষণের কারণে এখনও মানুষকে কারাগারে রাখছে।’
মাদুরোবিরোধী একটি ব্যানার প্রদর্শনের দায়ে ওস্তোস দুই বছর কারাভোগ করেন। মার্চে মুক্তি পাওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে চলমান হত্যাচেষ্টা মামলায় প্রতি মাসে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
সরকার জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে ১ হাজার ৪৬ জন রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে বেসরকারি সংস্থা ফোরো পেনাল বলছে, এখনও প্রায় ৪০০ জন কারাগারে রয়েছেন।







