তথ্যপ্রযুক্তি
হাবল ধ্রুবকের রহস্য ও মহাজাগতিক সংকট

ধরুন আপনি দু’জন বন্ধুকে বললেন, একই রাস্তার দূরত্ব মাপতে। একজন বলল ১০ কিলোমিটার, আরেকজন বলল ১২ কিলোমিটার। দু’জনই ভালো যন্ত্র ব্যবহার করেছে, দু’জনই আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু সংখ্যা মিলছে না। তখন প্রশ্ন উঠবেই, ভুলটা কোথায়?
মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই হচ্ছে। মহাবিশ্ব কত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে? সেই গতি মাপার সংখ্যাকে বলা হয় হাবল ধ্রুবক। আর এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এসট্রোসফেয়ারের একদল গবেষক গবেষণার কাজটি করেছেন।
১৯২৯ সালে হাবল দেখিয়েছিলেন, দূরের গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে সরে যাচ্ছে। যত দূরে গ্যালাক্সি, তত দ্রুত সে দূরে সরে যায়। এই আবিষ্কার মানবজাতির মহাবিশ্ব, বোঝার ধরণ বদলে দেয়। মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি প্রসারিত হচ্ছে। সেই প্রসারণের হারই হাবল ধ্রুবক।
কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী পর এসে, সেই সংখ্যাটিই হয়ে উঠেছে আধুনিক কসমোলজির এক বড় প্রশ্ন। বিজ্ঞানীরা এই হার মাপার জন্য দুইটি প্রধান পথ ব্যবহার করেন। প্রথমটি হলো প্রাচীন মহাবিশ্বের আলো দেখা। বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩৮০,০০০ বছর পর যে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটিই আজ আমরা দেখি Cosmic Microwave Background (CMB) হিসেবে। এই প্রাচীন আলো বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হিসাব করেছে। তাদের ফলাফল বলছে—মহাবিশ্বের প্রসারণের হার প্রায় ৬৭ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড প্রতি মেগাপারসেক।
অন্য পথটি হলো কাছের মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করা। Cepheid পরিবর্তনশীল নক্ষত্র এবং Type Ia সুপারনোভা ব্যবহার করে দূরত্ব মাপা হয়। এই কাজে বড় ভূমিকা রেখেছে । এই পদ্ধতিতে পাওয়া মান প্রায় ৭৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড প্রতি মেগাপারসেক।
সংখ্যার পার্থক্য শুনতে ছোট, ৬৭ আর ৭৩। কিন্তু কসমোলজির জন্য এটি বিশাল অমিল। বিষয়টি এতটাই স্পষ্ট যে এটি পাঁচ স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনেরও বেশি। সাধারণভাবে এই স্তর অতিক্রম করলে বিজ্ঞানীরা সেটিকে গুরুতর সংকেত হিসেবে দেখেন।
এখন প্রশ্ন হলো—ভুলটা কোথায়? প্রাচীন মহাবিশ্বের হিসাব কি ভুল? নাকি বর্তমান পর্যবেক্ষণে কোথাও সূক্ষ্ম ত্রুটি আছে?
বর্তমান কসমোলজির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কাঠামো হলো । এই মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বেশিরভাগই ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি দিয়ে গঠিত। দৃশ্যমান পদার্থ খুব সামান্য অংশ। এতদিন এই মডেল দিয়ে গ্যালাক্সির গঠন, মহাবিশ্বের বয়স, বৃহৎ কাঠামো—সবকিছু সফলভাবে ব্যাখ্যা করা গেছে।
কিন্তু হাবল টেনশন বলছে, হয়তো ছবিটা পুরো নয়। কেউ বলছেন প্রাচীন সময়ে ডার্ক এনার্জির আচরণ আলাদা ছিল, যাকে “Early Dark Energy” ধারণা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ ভাবছেন, হয়তো এমন কোনো নতুন কণা বা প্রভাব আছে যা এখনো আমাদের সমীকরণে ধরা পড়েনি।
আবার অনেক বিজ্ঞানী সতর্কভাবে বলছেন—এটি হয়তো খুব সূক্ষ্ম ক্যালিব্রেশন সমস্যা। কিন্তু যত নতুন পর্যবেক্ষণ আসছে, ততই দেখা যাচ্ছে অমিলটি সহজে মিলছে না।
এটি ধ্বংসাত্মক সংকট নয়, বরং জ্ঞানের সংকট। ইতিহাসে দেখা গেছে, এমন অমিলই বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। ছোট অসামঞ্জস্য থেকেই জন্ম নিয়েছিল নতুন তত্ত্ব।
আজ প্রশ্নটা খুব সরল, মহাবিশ্ব কত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে? কিন্তু এই সরল প্রশ্নের দুইটি শক্তিশালী উত্তর মিলছে না। একদিকে প্রাচীন মহাবিশ্বের ছবি, অন্যদিকে বর্তমান গ্যালাক্সির গতি। দুই সময়ের এই নীরব দ্বন্দ্বই “Hubble Tension”।
হয়তো ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণ এই টানাপোড়েন কমাবে। আর যদি না কমায়, তবে হয়তো আমাদের মহাবিশ্ব, বোঝার পদ্ধতিই বদলাতে হবে।
৬৭ না ৭৩, সংখ্যাটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো ছোট পার্থক্যই সবচেয়ে বড় গল্পের সূচনা করে।







