জাতীয়
বাহাত্তরের সংবিধান ভারতের অনুগত পাকিস্তানি জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত একটি গোলামির ফাঁস

নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং জুলাই গণহত্যার বিচার দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ। সংগঠনটির আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান দাবি করেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি জনগণের ভোটে প্রণীত হয়নি।
শনিবার বাদ যোহর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
খোমেনী ইহসান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি বাংলাদেশের জনগণের বদলে ভারতের অনুগত পাকিস্তানি জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত গোলামির ফাঁস। তাই জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া এ সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনের নাটক বাদ দিয়ে জনগণের ভোটে নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সংবিধান নিয়ে রাজনীতিতে চরম বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। আমরা রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা পেলেও বাংলাদেশের নাগরিকদের ভোটে গঠিত গণপরিষদের মাধ্যমে এখানে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়নি। বরং পাকিস্তানের নাগরিকদের ভোটে পাকিস্তানের জন্য গঠিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে করা বাহাত্তরের গোলামী চুক্তির বলে বাংলাদেশের ওপর গণবিরোধী সংবিধান চাপিয়ে দিয়েছে।
সমাবেশে সভাপতি খোমেনী ইহসান বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নকারীরা ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের নির্বাচন করার সময় অঙ্গীকার করেছিল কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী সংবিধান ও আইন প্রণয়ন করবে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর তারা অবৈধভাবে সংবিধান প্রণয়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ওপর ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে ভারতের প্রতি অনুগত একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি গড়ে তোলার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। ফলে এ দেশে ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ, বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান ঘটলেও জনগণের প্রকৃত মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর চলমান বিতর্কের সমালোচনা করে খোমেনী ইহসান বলেন, চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা রেজিম পালিয়ে যাওয়ার পর বর্তমান সংবিধান পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। তখন দেশ চলেছে সামাজিক চুক্তির আওতায়। কিন্তু ছাত্রজনতা অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগ দেওয়ার পর শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই পরিত্যক্ত সংবিধান পুনর্বহালের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিদেশি নাগরিক আলী রিয়াজের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হয় এবং হাসিনার রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে গণভোটের নামে জুলাই বিপ্লবকে পরিত্যক্ত সংবিধানের আওতায় বৈধতার প্রশ্নে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
সমাবেশে তিনি অবিলম্বে জুলাই গণহত্যার বিচার ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে পিলখানা ও শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইয়েদ কুতুব বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল করা সময়ের দাবি। কারণ জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও জনগণকে ক্ষমতায়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো বাহাত্তরের সংবিধান। ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকার বারবার এই সংবিধানের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। তাই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নতুন জনগণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন সময়ের দাবি।
সংগঠনটির সহকারী সদস্য সচিব আব্দুস সালাম বলেন, দেড় বছর ধরে সংস্কারের নামে তামাশা করে নির্বাচনের পর সংসদে আবার সংস্কারের নাটক শুরু হয়েছে। কিন্তু জনগণ জানে ১২ ফেব্রুয়ারি কীভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে এবং কীভাবে বিএনপি ও জামায়াত সরকার ও বিরোধী দল হয়েছে। তাই টালবাহানা না করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচার করতে হবে।
বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সদস্য সচিব ফজলুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও জনগণতান্ত্রিক সংবিধানের দাবি জানাতে হওয়া লজ্জাজনক। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন সংবিধান প্রণয়ন প্রয়োজন।
বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সহকারী সদস্য সচিব জিহাদী ইহসান বলেন, গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—শাসক আসে, শাসক যায়; কিন্তু জনগণ রক্ত দিয়ে যায়, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। কারণ, ৭২-এর সংবিধান মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার বন্দোবস্ত ছাড়া রাষ্ট্র ও জনগণকে কিছুই দেয়নি।
স্বৈরাচার তৈরি করা ছাড়া বাহাত্তরের সংবিধান বাংলাদেশকে কী দিয়েছে—এ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সংবিধান বলে ক্ষমতাসীন দলগুলো লুটপাট, গুম ও খুনের বৈধতা তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে জুলুমের রাষ্ট্র কায়েম করেছে। আমরা এমন একটি জনগণতান্ত্রিক সংবিধান চাই, যেখানে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। রাজনৈতিক দলের অসীম ক্ষমতা তৈরি করার সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সহকারী সদস্য সচিব গালীব ইহসানের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন প্যান ইসলামিক মুভমেন্টের নেতা অ্যাডভোকেট শাহ আব্দুল আজীজ। এ সময় জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য সাইদুল ইসলাম, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সহকারী সদস্য সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মো. আরিফুল ইসলামসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।







