এক্সক্লুসিভ
মা: অস্তিত্বের শিকড় ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক মহাকাব্য

মা দিবসের এই রঙিন আবহের মাঝেও একটি ধূসর চিত্র আমাদের ব্যথিত করে—তা হলো ‘বৃদ্ধাশ্রম’
বিশ্ব মা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটি উৎসর্গ করা হয়েছে পৃথিবীর সেই মানুষটির জন্য, যার হাত ধরে আমাদের পৃথিবীতে আসা। যদিও মাকে ভালোবাসার জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না, তবুও যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় অন্তত একটি দিন আমরা ঘটা করে বলতে চাই—‘মা, তোমায় অনেক ভালোবাসি।’
মা দিবসের প্রচলন কিন্তু খুব বেশিদিন আগের নয়। এর পেছনে রয়েছে আনা মারিয়া জার্ভিস নামক এক মার্কিন নারীর লড়াইয়ের গল্প। ১৯০৫ সালে তার মা অ্যান মেরি রিভস জার্ভিস মারা যাওয়ার পর, আনা তার মায়ের স্বপ্ন পূরণে নামেন। তার মা চেয়েছিলেন এমন একটি দিন থাকুক, যেদিন সন্তানেরা মায়ের প্রতি সম্মান জানাবে। ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘মা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। আজ সেই ধারা বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত।
‘মা’— কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি নিরাপত্তা এবং একটি পৃথিবী। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ এবং মানসিক প্রশান্তির প্রধান উৎস হলো মায়ের ছোঁয়া। জীবনের প্রথম কান্না থেকে শুরু করে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখর পর্যন্ত—প্রতিটি ধাপে ছায়ার মতো পাশে থাকেন মা। নিজের সুখ, শখ এবং ঘুম বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোই যেন পৃথিবীর সব মায়ের অলিখিত ব্রত।
তবে সময়ের সাথে সাথে মায়ের সংজ্ঞায় ভিন্নতা এসেছে। আজকের মা কেবল অন্দরমহলে সীমাবদ্ধ নন। তিনি একদিকে যেমন দক্ষ হাতে ঘর সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে সমান তালে লড়ছেন করপোরেট দুনিয়ায়। আধুনিক যুগে মা হওয়ার পাশাপাশি ক্যারিয়ার গড়া এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মায়েরা প্রমাণ করেছেন, তারা বহুমাত্রিক। তারা যেমন ল্যাপটপে কাজ করছেন, তেমনই সন্তানকে কোলে নিয়ে হোমওয়ার্ক করাচ্ছেন। এই যে অসাধ্য সাধন, এটাই একজন মায়ের প্রকৃত শক্তি।
মা দিবসের এই রঙিন আবহের মাঝেও একটি ধূসর চিত্র আমাদের ব্যথিত করে—তা হলো ‘বৃদ্ধাশ্রম’। যে মা নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু উজাড় করে সন্তানকে বড় করেছেন, শেষ বয়সে সেই সন্তানের ঘরে ঠাঁই না পাওয়াটা চরম অমানবিকতা। মা দিবস পালনের সার্থকতা তখনই হবে, যখন পৃথিবীর কোনো মাকে বৃদ্ধাশ্রমে চোখের জল ফেলতে হবে না। মাকে শুধু উপহার বা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে নয়, বরং তাকে সময় দিয়ে এবং সম্মান জানিয়ে আগলে রাখাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মেই মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ হিন্দু ধর্মে মা-কে দেবীর আসনে বসানো হয়েছে। সাহিত্যেও মা এক অমূল্য সম্পদ। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন:
"যেখানেতে দেখি যাহা, মা-এর মতন আহা,
একটি কথাতে এত সুধা মিশা-ইয়া নাই।"
সত্যিই, ‘মা’ ডাকের মধ্যে যে আদিম এবং অকৃত্রিম শান্তি লুকিয়ে আছে, তা আর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
মা দিবস কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। মা মানেই তো ভালোবাসা, মা মানেই তো বেঁচে থাকার প্রেরণা। এই দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—মায়ের মুখে যেন কখনো বিষাদের ছায়া না পড়ে। শরীর আর মনের বার্ধক্যে মা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, তখন আমরা যেন তার সেই শক্ত লাঠি হয়ে উঠতে পারি, যা তিনি আমাদের ছোটবেলায় ছিলেন।
পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। শুভ মা দিবস!






