বাণিজ্য

একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের ৭৫% ঋণের বিপরীতে নেই জামানত

প্রাইম বাংলাদেশ ডেস্ক

শেয়ারঃ

একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের ৭৫% ঋণের বিপরীতে নেই জামানত- খবরের থাম্বনেইল ফটো

একীভূত হওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক–সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রাপ্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এসব ব্যাংকের প্রায় ৭৫ শতাংশ ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত নেই। ন্যূনতম শর্ত না মেনেই বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করায় পরবর্তীতে বড় ধরনের খেলাপি সংকট তৈরি হয়।


এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে শেষ পর্যন্ত একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ইতোমধ্যে আমানত বিমা তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।


একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো— এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এই পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জামানত রয়েছে মাত্র ৪৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকার, অর্থাৎ মোট ঋণের মাত্র ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ।


বর্তমানে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৭ শতাংশেরও বেশি।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ একাই এসব ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা মোট ঋণের ৫২ শতাংশের বেশি। এছাড়া নজরুল ইসলাম মজুমদারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা।


কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এসব ঋণের বড় অংশই জামানতবিহীন ছিল বা অতিমূল্যায়িত জামানতের ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে খেলাপি হওয়ার পর অর্থ আদায় কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।


ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণ ৬৩ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর খেলাপি ঋণ প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা।


ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৮ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে জামানত মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণ প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা।


এক্সিম ব্যাংকের ৫২ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে জামানত ২১ হাজার কোটি টাকা হলেও খেলাপি ঋণ ৩৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।


সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৭ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণ প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা।


গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে জামানত মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণ প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।


আর্থিক সংকট ও তারল্য ঘাটতি মোকাবিলায় গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক” গঠন করে। নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।


এছাড়া আমানতকারীদের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে এবং আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আরও প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়েছে।


এ পর্যন্ত আমানত বীমা তহবিল থেকে ৮ লাখের বেশি গ্রাহককে প্রায় ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। শুধুমাত্র ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৩ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহক পেয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।


সংকটকালীন সময়ে ব্যাংকগুলোকে কার্যক্রম সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে।


তবে নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ব্যাংক রেজুলেশন আইনের সাম্প্রতিক সংশোধন ও একীভূত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট বার্তা না থাকায় আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।


সম্পর্কিত খবর