ক্যাম্পাস
জুনিয়র লেপার্ড ফুটবল একাডেমি: গ্রাম থেকে জাতীয় স্বপ্নের পথে এক ক্রীড়া বিপ্লব

বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়কে। কারণ একটি দেশের শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো গড়ে ওঠে প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণের অভাবে হারিয়ে যায়। সেই বাস্তবতা বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর গ্রামে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জুনিয়র লেপার্ড ফুটবল একাডেমি (JLFA)।
একাডেমিটির প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও প্রধান কোচ এস. এম. আর্শিনুল বাহার বর্তমানে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বিশ্বাস, জাতীয় দলের সাফল্য কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
করোনা মহামারির মতো কঠিন সময়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। সে সময় অনেকেই উদ্যোগটির সফলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে সীমিত অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ সরঞ্জামের ঘাটতি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও থেমে থাকেননি আর্শিনুল বাহার। তার লক্ষ্য ছিল শিশুদের আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক ফুটবল প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া।
একাডেমির শুরু থেকেই পাশে দাঁড়ায় ওয়েসিস ইয়ুথ অর্গানাইজেশন। পরবর্তীতে কাজের স্বচ্ছতা, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিকতার কারণে কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্বেচ্ছাসেবী পৃষ্ঠপোষকও একাডেমির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তাদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
জুনিয়র লেপার্ড ফুটবল একাডেমির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে শুধু ফুটবল খেলা নয়, খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং মানসিক বিকাশের ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠাতার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন ভালো ফুটবলার হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠাও এই একাডেমির মূল লক্ষ্য।
প্রতিষ্ঠানটির বড় অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফিফা, এএফসি এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) একাডেমিক স্বীকৃতি অর্জন। একটি গ্রামীণ অঞ্চলের একাডেমির জন্য এই স্বীকৃতি শুধু সম্মানের নয়, বরং মানসম্মত প্রশিক্ষণেরও স্বীকৃতি।
এছাড়া এস. এম. আর্শিনুল বাহার নিজেও এএফসি ও বাফুফে স্বীকৃত কোচিং কোর্স সম্পন্ন করেছেন। আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তিত ধারা, স্পোর্টস সায়েন্স, স্পোর্টস সাইকোলজি এবং দীর্ঘমেয়াদি খেলোয়াড় উন্নয়ন পদ্ধতিকে গ্রাসরুট পর্যায়ে বাস্তবায়ন করাই তার মূল লক্ষ্য।
অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই একাডেমির বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। কেউ বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, আবার কেউ জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছেন। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরি ও বিদেশি ক্লাবগুলোতে খেলোয়াড় সরবরাহ করার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে পথচলা এখনও সহজ নয়। উন্নত অবকাঠামোর অভাব, পর্যাপ্ত অর্থায়নের সংকট এবং তৃণমূল ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঘাটতি এখনও বড় প্রতিবন্ধকতা। তারপরও এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় রয়েছে একাডেমির।
আগামী ২০২৭-২০২৮ সালের মধ্যে জুনিয়র লেপার্ড ফুটবল একাডেমিকে একটি আবাসিক ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, পুষ্টি, মানসিক বিকাশ এবং চরিত্র গঠনের সমন্বিত সুযোগ পাবে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন কোনো প্রতিভাবান খেলোয়াড় পিছিয়ে না পড়ে, সেই লক্ষ্যও রয়েছে প্রতিষ্ঠানের।
দীর্ঘমেয়াদে শুধু একটি ফুটবল একাডেমি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন প্রতিষ্ঠাতা। যেখানে ফুটবলের পাশাপাশি স্পোর্টস সায়েন্স, স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট, পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিস, কোচিং শিক্ষা, ক্রীড়া গবেষণা এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে একটি আধুনিক ক্রীড়া কেন্দ্র।
জুনিয়র লেপার্ড ফুটবল একাডেমির গল্প মূলত একটি স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার গল্প। একটি গ্রামের ছোট্ট উদ্যোগ কীভাবে পরিকল্পনা, অধ্যবসায় এবং সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের স্বপ্ন দেখতে পারে, তারই এক অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ এই একাডেমি। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে জুনিয়র লেপার্ড ফুটবল একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।







