ক্যাম্পাস
বর্জ্যের সাথে তুষ ও কাঠের গুঁড়া থেকে ডিজেল তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলো কুয়েট, keywords
বর্জ্যই হবে জ্বালানি! কুয়েটের গবেষণায় মিলছে ডিজেলসমৃদ্ধ তেল

কুয়েট প্রতিনিধি
পরিবেশের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে ওঠা বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) একদল গবেষক। বর্জ্যের সঙ্গে ধানের তুষ ও কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
গবেষকদের দাবি, তাদের উদ্ভাবিত প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত বায়ো-ক্রুডে ৫০ শতাংশের বেশি ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের আমদানিনির্ভর ডিজেলের প্রায় ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলেও মনে করছেন গবেষকরা। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন নিয়ে কুয়েটে গবেষণাটি শুরু হয় প্রায় এক দশক আগে। প্রায় এক বছর আগে সরকারের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি রিসার্চ কাউন্সিলের সহযোগিতায় গবেষণাটিতে প্রাথমিক সাফল্য আসে। কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেকুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে।
গবেষণায় ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন (HTL) প্রযুক্তি। গবেষকদের মতে, এ পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করার আগে আলাদাভাবে শুকানোর প্রয়োজন হয় না। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে বায়ো-ক্রুড উৎপাদন করা হয়। পরবর্তী প্রক্রিয়ায় এ বায়ো-ক্রুড থেকে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষকদের দাবি, এ প্রযুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে ২০টির বেশি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক Q1 মানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মতে, গবেষণার ফলাফল বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ায় প্রযুক্তিটিকে এখন পরীক্ষাগার থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন তিন টন সক্ষমতার একটি প্ল্যান্ট স্থাপনে আনুমানিক ৮০ থেকে ১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজনীয় অর্থ ও অবকাঠামোগত সহায়তা পাওয়া গেলে বিনিয়োগের এক বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব বলেও জানিয়েছেন তারা।
গবেষণার বিষয়ে অধ্যাপক ড. খালেকুজ্জামান বলেন, ‘তাদের প্রকল্পে ইতোমধ্যে সফলতা এসেছে এবং উৎপাদিত ক্রুড অয়েলে ৫০ শতাংশের বেশি ডিজেল সমৃদ্ধ রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে দেশের আমদানিনির্ভর ডিজেলের প্রায় ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ প্রযুক্তি নিয়ে ২০টির বেশি গবেষণাপত্র Q1 জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে বলেও জানান তিনি।’
কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ বলেন, “দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক গবেষণা ও উদ্ভাবন হলেও অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলোর অনেকগুলোই গবেষণাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা বিশ্ববিদ্যালয়ের একার পক্ষে বহন করা কঠিন। সরকার এ ধরনের প্রযুক্তিকে উৎপাদন পর্যায়ে নিতে আর্থিক সহায়তা দিলে তা দেশের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন তিনি।”
গবেষকরা বলছেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, বর্তমানে পরিবেশের জন্য বোঝা হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎপাদনের কাঁচামালে পরিণত করা সম্ভব। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা দুই ক্ষেত্রেই এ প্রযুক্তি সম্ভাবনাময় ভূমিকা রাখতে পারে।






