মতামত

জলবায়ু বর্ণবাদের নীরব শিকার তিস্তা পাড়ের মানুষ

সুবর্ণা আক্তার

শেয়ারঃ

জলবায়ু বর্ণবাদের নীরব শিকার তিস্তা পাড়ের মানুষ- খবরের থাম্বনেইল ফটো

তিস্তার বুকে ছেলেকে নিয়ে আলুর ক্ষেতে পানি দিতে ব্যস্ত এক কৃষক। সেচ দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে তার কাছ থেকে জানতে পারি তাদের জীবিকার হালচাল। কৃষকটি জানায়, অতিবন্যার কারণে তারা ছয় মাস কাজ করতে পারে, আর বাকি ছয় মাস তাদের কাজ বন্ধ থাকে। বন্যার সময় তাদের প্রধান আয় আসে মাছ ধরা থেকে, আর শুকনো মৌসুমে চরের বুকে বিভিন্ন সবজি ও ফসল চাষাবাদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তবুও সেখানে প্রতিনিয়ত সেচের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। এছাড়া নদীভাঙন ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার সমস্যাও রয়েছে।


খালি চোখে আমরা সাধারণ মানুষ এসবকে সহজেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল নয়, বরং এটি জলবায়ু বর্ণবাদের এক নিষ্ঠুর উদাহরণ। তিস্তার মানুষের মতো বিশ্বের আরও অনেক অঞ্চলের মানুষ এই বৈষম্যের শিকার।


জলবায়ু বর্ণবাদ বলতে আমরা কী বুঝি, তা সহজভাবে বলা যায়—জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষ সমানভাবে ভোগ করে না। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশের মানুষ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম জলবায়ু সমস্যার সম্মুখীন হয়।


কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই উন্নত বিশ্বই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রধানত দায়ী। তাদের অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের কারণেই আজ তিস্তার মানুষের মতো অন্যান্য দেশের মানুষ জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করছে। কিছু দেশ কার্বন নিঃসরণ করে আর তার ভোগান্তি পোহায় অন্য দেশ—এই ঘটনাকেই বলা হয় জলবায়ু অবিচার।


জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী, তাদেরই এর দায়িত্ব নেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা দেখি, উন্নত দেশগুলো বিভিন্ন সময় নানা কার্যক্রমের কথা বললেও তার সঠিক বাস্তবায়ন হয় না। যতটুকু হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মোটকথা, কার্বন নিঃসরণ যতক্ষণ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো না যায়, ততক্ষণ এর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।


অন্যদিকে, অনেক উন্নত দেশের নেতারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ যে দায়ী, তা স্বীকার করতে চান না। তাদের এমন মনোভাবের কারণে অনেক পরিকল্পিত কার্যক্রম থমকে আছে, যা জলবায়ু বর্ণবাদের ক্ষতিগ্রস্তদের উপকারে আসতে পারত।


জলবায়ুর এই বর্ণবাদ ও অবিচার থেকে মুক্তি পেতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যেসব দেশ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী, তাদের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।


জাতীয় পর্যায়ে করণীয় হলো—টেকসই নদীবাঁধ নির্মাণ, জলবায়ু সহিষ্ণু ফসলের বিস্তার, নদীপাড়ের মানুষকে জলবায়ু বৈষম্য ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে সচেতন করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ। পাশাপাশি দেশীয় গণমাধ্যমের উচিত এ বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার করা, যাতে সাধারণ মানুষ সচেতন হতে পারে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকেও (এনজিও) এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।


এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তিস্তার মতো অঞ্চল থেকে জলবায়ু বর্ণবাদ দূর হবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে জলবায়ু ন্যায়বিচার।



লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর


সম্পর্কিত খবর