মতামত
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংবেদনশীল বিদ্যাপীঠের অপেক্ষায়

ছবি: এইচ. এম. হিজবুল্লাহ, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শত বাধা-বিপত্তির পাহাড় ডিঙিয়ে আর সংগ্রামের খরস্রোতা নদী পেরিয়ে যখন একজন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখে, তখন তার হৃদয়ে বেজে ওঠে নতুনের জয়গান। শরতের কাশফুলের মতো ধবল স্বপ্নগুলো ডানা মেলে উড়তে থাকে হৃদয়ের নীল আকাশে। কিন্তু এই আনন্দঘন মুহূর্তগুলো খুব দ্রুতই ফিকে হতে শুরু করে রূঢ় বাস্তবতার কাছে। আবাসনহীন ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর এই ক্যাম্পাসটি তখন আর সাধারণ বিদ্যাপীঠ থাকে না, বরং তাদের জন্য এক অপরাজেয় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।
একদিকে তীব্র আর্থিক সংকটের কষাঘাত, অন্যদিকে সুউচ্চ ভবনগুলোর সিঁড়ি যেন তাদের কাছে একেকটি অনতিক্রম্য সমুদ্র। তবে শারীরিক ও অবকাঠামাগত সীমাবদ্ধতার চেয়েও বেশি যাতনা দেয় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। উচ্চডিগ্রিধারী কারো কারো আচরণ যখন আদিম গুহাবাসীদের চেয়েও সংকীর্ণ হয়, তখন সেই বিদ্রূপ আর অবহেলার আঘাতে শিক্ষার্থীদের রঙিন স্বপ্নের বাগান মুহূর্তেই ধূসর হয়ে যায়। অথচ আমাদের সামান্য সদাচরণ, ভালোবাসার পরশ আর একটু সহমর্মিতার হাতই পারে তাদের সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিতে।
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক ক্যাম্পাস গড়তে আমাদের নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
শ্রেণিকক্ষ ও একাডেমিক সহায়তা
শ্রেণিকক্ষে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম সারিতে বা তাদের সুবিধামতো স্থানে আসন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি বিভাগের শিক্ষকদের উচিত তাদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া এবং কোনো পাঠ বুঝতে অসুবিধা হলে অতিরিক্ত সময় দিয়ে তা বুঝিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য 'ইনক্লুসিভ' শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা ও বাস্তবায়ন
উত্তরপত্র লেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান কর্তৃক অতিরিক্ত সময় বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ‘শ্রুতি লেখক’ নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দক্ষ লেখক নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। 'বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সেবা সংক্রান্ত নীতিমালা ২০২৫' প্রতিটি বিভাগে যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে।
অবকাঠামো ও আবাসন সুবিধা
আবাসন সংকট নিরসনে বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দ করা জরুরি। এছাড়া লিফটহীন বহুতল ভবনগুলোতে যাতায়াতের জন্য সহপাঠী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতামূলক মনোভাব পোষণ করতে হবে।
পরিবহন সেবা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বাসে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষিত রাখা।
সাধারণ নাগরিক সুবিধা ও স্বাস্থ্যসেবা
ক্যাফেটেরিয়ায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি কমাতে তাদের জন্য অগ্রিম খাবার অর্ডার এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা অনেক সময় হীনমন্যতার কারণে সহজে যোগাযোগ করতে পারে না। তাই সহপাঠী ও শিক্ষকদের উচিত তাদের সাথে সদয় আচরণ করা এবং বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ানো। বিভাগের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পথ প্রশস্ত হবে।
‘ডিজেবিলিটি রিসোর্স সেন্টার’ স্থাপন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে একটি আধুনিক ডিজেবিলিটি রিসোর্স সেন্টার স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এখান থেকে ব্রেইল পদ্ধতি, অডিও উপকরণ, স্ক্রিন রিডার, লো-ভিশন ডিভাইস ও হুইলচেয়ারসহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া তাদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা কাউন্সিলিং নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত শিক্ষক ও কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সমাজের বোঝা নয়, বরং তারা আমাদের সম্পদ ও অধিকারের দাবিদার। এই লড়াকু প্রাণগুলোর প্রতি আমাদের সামান্য প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও মানবিক আচরণই পারে একটি স্বপ্নাতুর শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করতে। তাদের স্বপ্নগুলো যেন বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট না হয়, বরং ডানা মেলে আকাশ স্পর্শ করে—সেই দায়িত্ব আমাদের সকলের।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


