মতামত

একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করি

মেহরাব হোসাইন

শেয়ারঃ

একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করি- খবরের থাম্বনেইল ফটো

নতুন বছরে আমার প্রধান প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।


দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের পূর্ববর্তী অধিকাংশ নির্বাচনই নানা কারণে বিতর্কিত ছিল। বাস্তবতা হলো—রাজনৈতিক দলগুলো প্রকৃত অর্থে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসেছে, এমন বিশ্বাস জনগণের মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী স্টেকহোল্ডারের পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতার মসনদে বসানো হয়েছে। এসব স্টেকহোল্ডারের মধ্যে আমলাতন্ত্র, এলিট শ্রেণি, ছোট-বড় রাজনৈতিক গোষ্ঠী, সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।


২০০৮ সালের নির্বাচনে আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনী–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভারত ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে পরাজিত করে। সে সময়কার প্রশাসন, সামরিক বাহিনী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের’ নামে দেশ ও জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশকে দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে এক ফ্যাসিবাদী আওয়ামী দুঃশাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।


আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পতিত আওয়ামী লীগ আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এবং তাদের হাতে থাকা বিপুল অবৈধ অর্থসম্পদ ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। যদি আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সেই সুযোগে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের দোসরেরা পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠবে। এতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


আমরা চাই বাংলাদেশে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হোক। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসা বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারি জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিক স্বীকৃতি ও সমমর্যাদা দিতে হবে। একইভাবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের প্রাপ্য সকল সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।


আমরা চাই না কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হোক। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু সম্প্রদায়কে যেভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তা সমাজে বিভাজন ও সংঘাতই বাড়িয়েছে; দেশ এতে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ নিয়েও ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। আমরা দেখেছি, কীভাবে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর নামে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল দর্শন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—যা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই মূলনীতিগুলো কখনোই সাংবিধানিকভাবে পূর্ণ বাস্তবায়ন পায়নি।


বর্তমানে যারা মুসলিম জাতীয়তাবাদের চর্চা করার দাবি করেন, তাদের একটি অংশের চিন্তাধারা অত্যন্ত সংকীর্ণ। অথচ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মুসলিম জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। আমরা দেখছি, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী সকল জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে অমুসলিম প্রার্থী দেওয়ার উদ্যোগ নিলে তথাকথিত মুসলিম জাতীয়তাবাদের দাবিদার কিছু ব্যক্তি কেবল প্রার্থীর হিন্দু পরিচয় নিয়ে সমালোচনা করছেন এবং হিন্দু প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব থেকে অমুসলিমদের বঞ্চিত করার মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।


মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ও গণবিরোধী বয়ান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে জনগণকে বিভাজিত করে রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ইসলামফোবিয়ার চর্চাও হয়েছে। আজও কিছু অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধের বয়ানের আড়ালে বিভাজন ও ঘৃণার রাজনীতি চালিয়ে যেতে চায়। আমরা এই বিভাজন, সংঘাত ও ঘৃণার রাজনীতির অবসান চাই।


শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এসব সমস্যার অনেকগুলোর সমাধানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বাকশাল-পরবর্তী বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং সকল রাজনৈতিক শক্তিকে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের বক্তব্যে আমরা সেই ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি। আশা করি, তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে একটি শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবেন।


সর্বোপরি, আমরা চাই বহিঃশক্তির আধিপত্যমুক্ত, স্বনির্ভর ও নিরাপদ বাংলাদেশ—যেখানে ন্যায়বিচার, সাম্য ও পরমতসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ধর্ম, বর্ণ ও দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত থাকবে।


লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, চাঁদপুর


সম্পর্কিত খবর