সারাদেশ

নেত্রকোণায় হাওরের পানিতে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন

প্রাইম বাংলাদেশ ডেস্ক

শেয়ারঃ

নেত্রকোণায় হাওরের পানিতে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন - খবরের থাম্বনেইল ফটো

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে জেলার হাওর পাড়ের কয়েক লাখ কৃষক পরিবারের মাঝে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।


গত ৩ দিনের ধারাবাহিক পানি বৃদ্ধিতে জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি হু হু করে বাড়ায় হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যার আশঙ্কা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।


পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার কংশ ও উপদাখালী নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করে লোকালয় ও নতুন নতুন ফসলি জমিতে প্রবেশ করছে।


এতে তলিয়ে গেছে জেলার ৯ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমির বোরো ফসল। একদিকে বন্যার আতঙ্ক, অন্যদিকে তীব্র শ্রমিক সংকট, জ্বালানির অভাব ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় মাঠের পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে কৃষক পরিবারের মাঝে চরম হাহাকার ও উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।


নেত্রকোণা পানি উন্নয়ন বিভাগের আজ সকাল ৯টার সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, জেলার নদীগুলোর পানি সমতলের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।


কলমাকান্দা স্টেশনে উপদাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ৪.৯০ মিটারের বিপরীতে বর্তমানে ৫.৭১ মিটারে অবস্থান করছে, যা বিপদসীমার ০.৮১ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং এখানে পানির প্রকোপ গত ২৪ ঘণ্টায় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।


জারিয়া স্টেশনে কংশ নদীর পানি ৬.৩৫ মিটারের বিপদসীমা ছাড়িয়ে ৭.৪৫ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপদসীমার ১.১০ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা এখনো ক্রমবর্ধমান।


এছাড়া খালিয়াজুরী স্টেশনে ধনু নদের পানি বিপৎসীমার ৪.১৫ মিটারের বিপরীতে ৪.০৩ মিটারে অবস্থান করছে, যা বিপদ সীমার মাত্র ০.১২ মিটার নিচে থাকলেও পানি বৃদ্ধির প্রকোপ অব্যাহত থাকায় যেকোনো সময় তা বিপদ সীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে।


আটপাড়া স্টেশনে মগড়া নদীর পানি ৬.০৪ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে যা বিপদসীমার ১.৩৯ মিটার নিচে এবং বিজয়পুর ও দুর্গাপুর স্টেশনে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ৪ থেকে ৫ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ক্রমাগত বৃদ্ধির প্রবণতা কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় সোমেশ্বরী নদীর বিজয়পুর ও দুর্গাপুর পয়েন্টে পানির প্রকোপ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আমিরুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ৫টি হাওর উপজেলা মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা এবং আটপাড়ায় আবাদের পরিমাণ ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর।


তিনি বলেন, গত ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাতে দুই দফায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।গত বুধবার পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও আজ নিমজ্জিত জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫শ’ হেক্টরে।


কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের ৬৫ শতাংশ এবং পুরো জেলার মোট ২১ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং পানি দ্রুত নেমে গেলে হাওরের অবশিষ্ট ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষকরা বাসস’কে বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে তারা মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতায় ৫০ শতাংশের বেশি ফসল এখনো ঘরে তুলতে পারেননি।


খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম, কৃষ্ণপুরের রুহুল আমিন ও চুনাই হাওরের কৃষকরা জানান, তাদের অর্ধেকের বেশি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।


অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও হাওরের পানি নিষ্কাশন পথগুলো পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যা অকাল বন্যা আসার আগেই ফসল ডুবিয়ে দিচ্ছে।


মোহনগঞ্জের বিরামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল ওয়াহাব মোড়ল বাসস’কে জানান, এ বছর ১শ’ কাঠা জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে ৫০ কাঠা জমির ফসল পানির নিচে নিমজ্জিত।


ধানকাটা শ্রমিকের তীব্র সংকটে ১২০০ টাকা দৈনিক মজুরিতেও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। হাওরের পানি নদীতে যেতে না পেরে বরং নদীর পানি ফসলি জমিতে চলে এসে ডুবিয়ে দিচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন।


সরেজমিনে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, জেলায় সরকারি ভর্তুকি মূল্যে দেওয়া ৬৪১টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর মেশিনের মধ্যে ৪৮৭টি মেশিন বিভিন্ন উপজেলায় কাজ করার কথা থাকলেও কৃষকরা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।


যদিও কৃষি বিভাগ দাবি করেছে যে, জ্বালানি ও যান্ত্রিক সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। কৃষকদের মতে, জ্বালানি তেলের অভাব এবং জলাবদ্ধতার কারণে অনেক নিচু জমিতে হারভেস্টর মেশিন নামানো সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি বর্তমানে প্রতি শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার ২শ’ টাকার বেশি দিয়েও লোক পাওয়া যাচ্ছে না।


বৃষ্টির সাথে অব্যাহত বজ্রপাত কৃষকদের মধ্যে আরও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত মঙ্গলবার খালিয়াজুরীতে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে ৩ জন কৃষক প্রাণ হারানোতে কৃষি শ্রমিকরা মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন।


পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবি) নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন সতর্ক করে বলেন, আগামী ৩ দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।


টানা ভারী বর্ষণের ফলে খালিয়াজুরী উপজেলার অর্ধেক বোরো ধান বর্তমানে পানির নিচে তলিয়ে আছে। এই বাস্তব চিত্র সরেজমিনে দেখতে জেলা প্রশাসক গতকাল দিনব্যাপী উপজেলার বোয়ালীর হাওর, জিয়াখরা হাওর, নাওটানা, বিরবিল্লাহ, কীর্তনখোলা ও গুচিগাইসহ বেশকিছু হাওর ঘুরে দেখেন এবং সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন।


পরিদর্শনকালে কৃষকরা বিশেষ করে উপজেলায় কৃষিখাতে অব্যবস্থাপনা, তীব্র শ্রমিক সংকট, ধানকাটা যন্ত্র হারভেস্টারের অভাব, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং শতাধিক ছোট-বড় জলমহাল দীর্ঘদিন খনন না করাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা জানান।


জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান কৃষকদের অভাব-অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে শোনেন এবং পর্যায়ক্রমে এসব সমস্যা সমাধানের দৃঢ় আশ্বাস দেন। এসময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারিভাবে আগামী ৩ মাস প্রণোদনা ব্যবস্থার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।


পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেত্রকোণা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত দুই সপ্তাহ ধরে হাওর এলাকায় দ্রুত ধান কাটার জন্য ব্যাপক প্রচারণা ও মাইকিং করা হচ্ছে।


জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বাসস’কে বলেন, নদ-নদীর পানি বাড়লেও বাঁধগুলো রক্ষায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পাউবো সার্বক্ষণিক তদারকি করছে। যেখানে ঝুঁকি রয়েছে সেখানে জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং পিআইসি কমিটিকে সতর্ক করা হয়েছে।


তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি ও মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে যেন তারা দ্রুত ফসল ঘরে তোলেন।


সম্পর্কিত খবর