আন্তর্জাতিক
বাংলাদেশে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে’ সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ ভারতের

বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে’ ভারত কখনোই সমর্থন বা সহযোগিতা করেনি বলে দাবি করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে সৃষ্ট ইস্যু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে না।
সোমবার (৫ মে) দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পানিবণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত পরিস্থিতি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং সার্ক-বিমসটেকসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিক্রম মিশ্রি বলেন, “আমরা অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকবে, তাদের সঙ্গেই আমরা কাজ করব। তবে এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভারত কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি।”
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করায় তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি নাম উল্লেখ না করে বলেন, “কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক প্রভাবিত হবে বলে আমি মনে করি না।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জানান, বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের ৪০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থবির হয়ে পড়া এসব কাঠামো আবার সক্রিয় করতে কাজ করছে দিল্লি। ইতোমধ্যে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও যোগাযোগ হয়েছে এবং বিভিন্ন যৌথ বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিক্রম মিশ্রি এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে যান।
গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে তিনি বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হলেও বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমেই বিষয়টির সমাধান করা হবে। তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে আছে। তবে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, অতীতে সার্ককে কার্যকর করতে ভারত চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সন্ত্রাসবাদ ইস্যুর কারণে তা সফল হয়নি। এ অবস্থায় ভারত এখন বিমসটেককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় এ প্ল্যাটফর্মে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নয়ন নিয়ে এক প্রশ্নে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপ যেন আমাদের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে ব্যাহত না করে।”
ভারত থেকে বাংলাদেশে অনিয়মিত অভিবাসী ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে কয়েক বছর ধরে প্রায় তিন হাজার সন্দেহভাজন ব্যক্তির জাতীয়তা যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হলেও এ বিষয়ে পর্যাপ্ত সাড়া পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিএসএফ ‘সাপ ও কুমির ছাড়ার’ পরিকল্পনা করছে—ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরও নাকচ করেন বিক্রম মিশ্রি। তিনি বলেন, “এ ধরনের খবর ভারত সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।”
ভারতের ঋণ সহায়তা নিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোন প্রকল্পে কাজ হবে, তা বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করবে। নতুন সরকার নতুন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করলে সে অনুযায়ী আলোচনা করতে ভারত প্রস্তুত রয়েছে।
বাংলাদেশিদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম চালুর বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা না জানালেও তিনি বলেন, এ বিষয়ে দ্রুত সমাধানে কাজ করছে দিল্লি।
রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশের মূল প্রয়োজন পরিশোধিত তেল এবং ভারত বিদ্যমান সহযোগিতার আওতায় সে সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিভাগের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।







