এক্সক্লুসিভ
বইলে পেটে ভাত যায়, না বইলে যায় না

আজ ১০ মে, বিশ্ব মা দিবস। পুরান ঢাকায়, যেখানে সরু গলি আর ব্যস্ত জনজীবনের ভিড়ে প্রতিদিন জন্ম নেয় হাজারো স্বপ্ন। কেউ এখানে ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় পথ চলে, কেউ আবার জীবনযুদ্ধের ক্লান্তি লুকিয়ে হাসতে শেখে। এ পুরান ঢাকা শুধু ইট-পাথরের শহর নয়, এখানে মানুষের কান্না আছে, হাঁসি আছে, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাসও আছে। এমনি একজন মা মানসুরা বেগম। শত ভিড়ের মাঝে তার সাথে কথোপকথন। রাজধানীর মালিটোলা এলাকায় দীর্ঘ প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে ফুটপাতে চিতই পিঠা বিক্রি করেন তিনি। তাঁর শাশুড়ির হাত ধরে শুরু হওয়া এই পারিবারিক ব্যবসায় এখন তিনিই হাল ধরেছেন। তবে বর্তমান বাজারের ঊর্ধ্বগতি আর আয়ের তুলনায় ব্যয়ের অসংগতিতে এই পেশায় থেকে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি জানান, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে তাঁর ছয় সদস্যের সংসার। বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকে, সেরকম খোঁজ খবর নেয় না। ছোট দুই সন্তানকে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তার মেয়ে মাদ্রাসায় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। ছোট ছেলের বয়স ৫ বছর। ছোট ছেলেকেও মাদ্রাসায় পড়ানোর ইচ্ছা তার। পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করার শখ তার।
ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট গ্রাম থেকে শহরে আসা মানসুরা বেগমের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে জীবনযুদ্ধের নানা টানাপোড়েনের কথা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসার কীভাবে চলছে জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বইলে পেটে ভাত যায়, না বইলে যায় না মামা, বুঝেন না?
পরিবারের কথায় এই নারী জানান, তাঁর শাশুড়ি একসময় এই এলাকায় ব্যবসা শুরু করেছিলেন। শাশুড়ি বয়সের ভারে শয্যাশায়ী হওয়ায় তিনি নিজেই দোকানের দায়িত্ব নিয়েছেন।
পারিবারিক আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে গিয়ে তিনি জানান, দুই রুমের একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। মাস শেষে শুধু ভাড়াতেই গুণতে হয় ১০,০০০ টাকা। এছাড়াও শাশুড়ির ওষুধ,মেয়ের পড়াশোনার খরচ সহ অনান্য পারিবারিক খরচ রয়েছে। মাঝেমধ্যে ঋণ করে চলতে হয়। তিনি বলেন, এই মাসেও তিনজনের কাছ থেকে ধার করে বাসার ভাড়া দিয়েছি। আয় এতই কম যে প্রতি মাসেই ঋণের জালে আটকে থাকতে হয়।
ব্যবসায়িক মন্দার বিষয়ে তিনি জানান, আগে বিক্রির পর হাতে কিছু টাকা থাকলেও এখন কেরোসিন তেল থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, দুই কেজি কেরোসিন তেলের দাম এখন ৩০০ টাকা। প্রতিদিন যা আয় হয়, তা দিয়ে ঘর ভাড়া আর পরিবারের খাবার জোগাড় করতেই শেষ হয়ে যায়। বাড়তি কোনো সঞ্চয় থাকে না।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত এই বিক্রেতা জানান, কষ্ট হলেও সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়াশোনা করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তাঁর মতে, সন্তানদের সঠিক শিক্ষায় বড় করতে না পারলে তারা বিপথে যেতে পারে। আর তিনি চান তার সন্তানদের জীবন যেন তাদের মতো না হয়।
সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন এই লড়াকু নারী। তিনি বলেন, এখন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করেই টিকে আছি। আল্লাহ দিলে কোনোমতে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন আমাদের বড় জয়।







