ক্যাম্পাস
জবির সম্পূরক বৃত্তি
বাজেট সংশোধনের মারপ্যাঁচে আটকে আছে শিক্ষার্থীদের পাওনা

ঐতিহাসিক ‘লং মার্চ টু যমুনা’ আন্দোলনের এক বছর পার হলেও এখনো সম্পূরক বৃত্তির টাকা হাতে পায়নি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মুখে দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর বাজেট সংশোধনের মারপ্যাঁচে আটকে আছে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য পাওনা। এই দীর্ঘসূত্রতায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছরের ১৪ মে আবাসন সংকট নিরসনসহ তিন দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে লং মার্চ করেন জবি শিক্ষার্থীরা। পুলিশি বাধা, টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেডে রক্তাক্ত হয়েছিলেন শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। তিন দিন অবস্থানের পর ইউজিসি দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চতুর্থ কিস্তির সম্পূরক বৃত্তির টাকা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে পৌঁছায়নি। যদিও ৫৬ কোটি টাকার একটি প্রাথমিক হিসাব ছিল, তবে সরকারি বাজেট পুনঃসংশোধনের কারণে আপাতত ৩০ কোটি টাকা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত যুদ্ধজনিত বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও সরকারি বাজেট সংকোচনের কারণেই ইউজিসি ও মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়ায় এই দেরি হচ্ছে।
আন্দোলনে আহত ও রক্তাক্ত হওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে নিজেদের অধিকারের দাবি জানাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মারুফ হাসান বলেন, "আজ একটি বছর পার হয়ে গেল, অথচ বৃত্তির টাকা পেলাম না। কত ভাই-বোন রক্ত দিয়েছে! এই দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া মানে তাদের ত্যাগের সাথে বেইমানি করা।" ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুলাইমান ফকির বলেন, "আমাদের হল নেই, অমানবিক কষ্ট করে মেসে থাকতে হয়। যমুনা আন্দোলনে দাবি পাশ হলেও প্রশাসন ও ইউজিসি আমাদের দিকে নজর দিচ্ছে না। সুযোগ-সুবিধা দিতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিক।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো এই ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনকে দায়ী করছে। শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইব্রাহিম খলিল বলেন, "বর্তমান উপাচার্য তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি পূরণের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রশাসনও আগের প্রশাসনের মতোই ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যথাযথ তদারকি করছে না বলেই টাকা আসছে না।"
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল বলেন, "সম্পূরক বৃত্তি আমাদের আন্দোলনের ফসল। সাবেক উপাচার্য ও প্রক্টরের আশ্বাসে আমরা আন্দোলন থেকে উঠে এসেছিলাম। তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, বর্তমান প্রশাসনও সেই পথেই হাঁটছে।"
শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি এ কে এম রাকিব বলেন, "আগের প্রশাসন আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে, ইউজিসির মূল সমস্যাগুলো আমাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। বর্তমান প্রশাসন চেষ্টা করছে বলে দাবি করছে, তবে তারা না পারলে আমাদের স্পষ্ট বলে দিক।"
বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, "শিক্ষার্থীদের ৫৬ কোটি টাকার মধ্যে একটি বড় অংশ হলের নির্মাণকাজ এবং বাকিটা বৃত্তির জন্য। যুদ্ধের কারণে বাজেট কাটছাঁট হওয়ায় ইউজিসিকে পুনরায় সংশোধিত বাজেট পাঠাতে বলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার কারণেই দেরি। ইউজিসি টাকা ছাড়লেই আমরা শিক্ষার্থীদের বণ্টন করে দেব।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ্ উদ্দীন বলেন, "অতীতে এটি আদায় করতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা ছিল। তবে এখন আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। টাকা হাতে না আসা পর্যন্ত আমাদের এই প্রচেষ্টা সফল বলা যাবে না।"
সংশ্লিষ্টরা জানান, সব প্রক্রিয়া শেষ করে চলতি বছরের মে মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা বৃত্তির টাকা হাতে পেতে পারেন। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, এই 'আশ্বাস' যেন আবারও দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে না পড়ে।




