জাতীয়
মাঠে সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ও সহিংসতার অভিযোগ

হঠাৎ করেই রাজপথে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়তে দেখা যাচ্ছে। কোথাও তারা ঝটিকা মিছিল করছে, আবার কোথাও ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলোর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা, সংঘর্ষ, মামলা ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর দলটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে বিরত থাকে। তবে বিভিন্ন সময় গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা এবং সীমিত আকারে অনলাইন ও অফলাইনে তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির অধিকাংশ নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। দলীয় সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। একই সময়ে দলের বহু শীর্ষ নেতা দেশ ও বিদেশে অবস্থান নেন।
স্থানীয় পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী এখনো আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু এলাকায় ছোট পরিসরে মিছিল ও কর্মসূচির চিত্রও দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অনলাইন পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমিত আকারে ৩৯টি মিছিলের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৫, ঢাকা জেলায় ২টি, গাজীপুরে ১টি, নারায়ণগঞ্জে ২টি, মুন্সীগঞ্জে ১টি, শেরপুরে ২টি, গোপালগঞ্জে ২টি, ফরিদপুরে ১টি, কিশোরগঞ্জে ১টি, ময়মনসিংহে ৩টি, নেত্রকোণায় ২টি, বরিশাল মহানগরে ১টি, বরিশাল থানা পর্যায়ে ১টি, পটুয়াখালীতে ১টি, রংপুরে ১টি, সিরাজগঞ্জে ১টি, চট্টগ্রামে ১টি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১টি মিছিল করে।
সম্প্রতি দলটির অঙ্গ সংগঠনের রাজপথে সক্রিয়তার কারণে এরই মধ্যে কয়েকটি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ১৬ মে রাতে কক্সবাজারের উখিয়ার টাইপালং এলাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক বিএনপি সমর্থকের পোস্ট ও এতে হা-হা রিয়্যাক্টকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় এক নারী নিহত হয়েছেন। নিহত সৈয়দা খাতুন (৫০) ওই এলাকার বাসিন্দা সব্বির আহমেদের স্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ এন এম সাজেদুর রহমান জানান, এলাকার একটি মাদ্রাসায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দেয়াল লিখন নিয়ে স্থানীয় বিএনপি সমর্থক আকাশ ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। সেই পোস্টে হা-হা রিয়্যাক্ট দেন স্থানীয় এক যুবক। আকাশ কারণ জানতে চাইলে সেই যুবক দাবি করেন, তিনি নন, তার স্ত্রী ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করেন। এসপি আরও বলেন, এ ঘটনার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটলে ওই যুবকের দুঃসম্পর্কের খালা সৈয়দা খাতুন আহত হন। এ সময় সেই যুবককে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং হাসপাতালে সৈয়দা খাতুনকে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে স্থানীয় এ বিষয়ে একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরে টাইপালংয়ের একটি মাদ্রাসার দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখাকে কেন্দ্র করে থানায় করা অভিযোগের ভিত্তিতে ওই এলাকার দুটি পক্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আসছিলেন।
১৪ মে রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর ও বিশ্বরোড এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিল ঠেকাতে গিয়ে হামলায় ছাত্রদল, যুবদল ও ছাত্রশিবিরের অন্তত চারজন নেতাকর্মী আহত হন। আহতরা হলেনÑ জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মো. রোকন উদ্দিন, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাহিম উদ্দিন, জেলা নবীন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ আসিফ ও যুবদল নেতা শাহীনুল ইসলাম শাহীন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ওইদিন রাতে বিশ্বরোড এলাকায় একটি ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ। এ সময় মিছিল প্রতিহত করতে গেলে কয়েকজনের ওপর হামলা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ঘটনার একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া করতে দেখা গেলেও, ধাওয়া-খাওয়া ব্যক্তিদের দেখা যায়নি। এদিকে ধাওয়াকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী রয়েছে সন্দেহে একটি দোকানঘরে হামলা চালায় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ছাড়া ১৭ মে সকালে রাজধানীর আসাদগেট এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে মিছিল করার চেষ্টা করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিলে ব্যানার-ফেস্টুন ফেলে পালিয়ে যান তারা। পুলিশ বলছে, মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের ধরতে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের এডিসি জুয়েল রানা বলেন, এদিন সকালে আসাদগেট এলাকায় একটি মিছিল বের করেছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে পুলিশ সদস্যরা মিছিল দেখে ধাওয়া দিলে তারা ব্যানার-পোস্টার ফেলে পালিয়ে যান। মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে তাদের ধরা হবে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে রাজধানীর শাহবাগে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতার মালা দিয়েছে দুবৃত্তরা। ১৫ মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শাহবাগের স্মৃতিস্তম্ভ থেকে জুতার মালাগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন একজন। জুতার মালা সরিয়ে নেওয়া সেই ব্যক্তি বলেন, যারা জুলাইকে অস্বীকার করে তারাই এ কাজ করেছে। কারা এর বিপরীত শক্তি, কাদের গায়ে লাগে জুলাইয়ের স্কাল্পচার এটা বুঝতে বাকি নাই, কারা এসব করেছে। তারা সুযোগ পেলে এগুলো করবে, এটা তেমন কিছু না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হতে শুরু করেন। বন্ধ কার্যালয় খোলার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাদের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দ্বিধা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের সম্ভাব্য তৎপরতা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। বিষয়টি আমলে নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন কার্যক্রমকে নজরদারিতে রেখে এরই মধ্যে নগরজুড়ে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার পাশাপাশি ভোরবেলা অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের দিবস আছে কি নেই, এটি দেখার বিষয় নয় এবং কোনো ধরনের হুমকিও নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে নানা ধরনের বিষয়বস্তু লক্ষ করা যাচ্ছে। পুলিশ সব অপরাধীকে প্রতিহত করার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। যেকোনো অপরাধীর অপতৎপরতা ঠেকাতে সার্বক্ষণিক বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে।








