জাতীয়

ব্যাংক ডাকাতের গাড়িতে চড়ে সংসদে যাওয়া সরকার জনগণের নয়

ডেস্ক

শেয়ারঃ

ব্যাংক ডাকাতের গাড়িতে চড়ে সংসদে যাওয়া সরকার জনগণের নয়- খবরের থাম্বনেইল ফটো

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেছেন, “ব্যাংক ডাকাতের গাড়িতে চড়ে সংসদে যাওয়া সরকার জনগণের নয়। তারা নিজেদের জন্য অনেক কিছু করতে পারলেও জনগণের জন্য কিছু করতে পারবে না। গত তিন মাসে তার প্রমাণ মিলেছে।”


শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে ১১-দলীয় ঐক্য আয়োজিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।


ড. শফিকুর রহমান বলেন, “আগে শোনা যেত সবাই খারাপ, শুধু শেখ হাসিনা ভালো। এখন শোনা যাচ্ছে সবাই খারাপ, শুধু প্রধানমন্ত্রী ভালো। মূলত ফ্যাসিস্ট আমলের দেখিয়ে দেওয়া পথেই এই সরকার হাঁটছে। তারা জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন করতে পারবে না।”


সমাবেশে যোগ দিতে শনিবার দুপুর ১২টা থেকেই চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাগপা, এলডিপিসহ ১১-দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা লালদিঘি ময়দানে আসতে থাকেন। বিকেল ৩টার আগেই সমাবেশস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। সমাবেশকে কেন্দ্র করে লালদিঘি ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।


সরকারের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, “আপনারা ভালো কাজ করলে আমরা প্রশংসা করব। কিন্তু ভুল বা খারাপ কাজ করলে অবশ্যই সমালোচনা করব। আপনাদের সময় খুবই সীমিত। এই সীমিত সময়ে যদি নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেন, তাহলে অভিনন্দন জানাব। আর না হলে বিদায়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রয়োজনে এই চট্টগ্রাম থেকেই সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”


কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তিনি বলেছেন, মদ ও সিগারেটের দাম বাড়ানোর কারণে বিরোধী দল বাজেটের সমালোচনা করছে। কিন্তু আমরা মদের দাম বাড়ানোর জন্য নয়, তেল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনা করছি। প্রয়োজনে রাজপথেও নামব। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুয়া।”


তিনি আরও বলেন, “গণভোটের গণরায় সরকারকে অবশ্যই মানতে হবে। সরকার দাবি করে, ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ৭০ শতাংশ মানুষের গণভোটের রায় তারা দেখতে বা বুঝতে চায় না। জনগণ জানে কীভাবে তাদের সেই রায় দেখাতে হয়। ১৯৯৬ সালে যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল, প্রয়োজন হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নেও সেভাবেই বাধ্য করা হবে। জুলাইয়ের সঙ্গে কোনো আপস হবে না।”


জাতীয় সংসদে স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “অনেক বিষয়ে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে বাকস্বাধীনতা হরণ করা হলে আমরা জনতার সংসদে ফিরে আসতে বাধ্য হব। যে সরকার জনগণের রায় মানে না, সে সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না। জনগণের রায় উপেক্ষা করলে জনগণ বসে থাকবে না।”


তিনি বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম জনগণের সব সমস্যার সমাধান সংসদে হোক। কিন্তু সরকার তা চায়নি। সরকার আমাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। এখানে আর কোনো স্পিকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে না।”


সীমান্ত ইস্যুতে তিনি বলেন, “দেশের সীমান্ত নিয়ে সংসদে আলোচনা করার জন্য আমরা নোটিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু তা নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। ভয় কিসের? কাকে ভয় পান? কাকে খুশি করতে চান? যদি সত্যিই জনগণের সরকার হয়ে থাকেন, তাহলে সংসদে আলোচনা করার সুযোগ দিন। আমরা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে নয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করতে আলোচনা করতে চাই।”


সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বীর বিক্রম বলেন, “যারা প্রধানমন্ত্রীর পাশে রয়েছেন, তারা তাকে ভুল বুঝাচ্ছেন। অন্যদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ইঁদুর আপনার ঘরেই আছে। দিল্লির দাস ও দালালেরা আপনার ঘরেই রয়েছে। আগে নিজের ঘর সামলান, তারপর অন্যকে দোষ দিন। এভাবে সবাইকে শত্রু বানিয়ে বেশি দিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।”


তিনি আরও বলেন, “সময় থাকতে বিরোধী দলকে বন্ধু বানান। কারণ বিরোধী দল নিজেদের স্বার্থের জন্য নয়, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য কাজ করছে।”


ভারতের উদ্দেশে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের দড়ি-ছেঁড়া গরু শুভেন্দুকে সামলাতে না পারলে ভারতের পরিস্থিতি বেগতিক হবে।”


এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারবে না, কারণ তারা শুরু থেকেই জনগণের রায়কে উপেক্ষা করেছে। সংস্কার না করার কুফল জনগণ আরও দেখতে পাবে।”


তিনি বলেন, “সরকার যদি সংস্কার না করে, তাহলে জনগণ আবারও গণঅভ্যুত্থানের পথে হাঁটবে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড আবারও শুরু হয়েছে। জনগণ একদিকে, সরকার আরেকদিকে অবস্থান করছে। সীমান্তে জনগণ বিজিবিকে সহযোগিতা করছে, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্ত হত্যাকে বৈধতা দিচ্ছেন।”


বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, “জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও জনমতের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ না করে জনগণের দাবি মেনে নেওয়াই রাষ্ট্র পরিচালনার সঠিক পথ।”


ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, “নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি টিকে থাকতে পারবে না। জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।”


এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, “পার্লামেন্ট থেকে সচিবালয়—সব জায়গায় হুতুমপেঁচারা বসে আছে। তারা দুর্নীতি, অনিয়ম ও নানা অপকর্মে জড়িত। সরকারের ঘোষিত এটি কোনো বাজেট নয়; এটি মূলত বিএনপির নেতাকর্মীদের পকেট ভারী করার গেজেট। যে বাজেটে বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই, সেটি প্রকৃত অর্থে কোনো বাজেট নয়।”


সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিশের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার।


সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান।


সম্পর্কিত খবর