জাতীয়

বড় দুর্যোগে ভেঙে পড়তে পারে ঢাকার সেবা ব্যবস্থা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

ডেস্ক

শেয়ারঃ

বড় দুর্যোগে ভেঙে পড়তে পারে ঢাকার সেবা ব্যবস্থা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী- খবরের থাম্বনেইল ফটো

দেশে বিদ্যমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ও স্থায়ী নির্দেশিকায় দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট নয় উল্লেখ করে তা দ্রুত পর্যালোচনার তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম. এ. মুহিত। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগে ঢাকার মতো মেগাসিটিতে শুধু জানমালের ক্ষতিই হবে না, ভেঙে পড়তে পারে পুরো দেশের ‘নার্ভ সেন্টার’ খ্যাত রাজধানীর সামগ্রিক সেবা ব্যবস্থা।


সোমবার দুপুরে রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে “দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর স্বাস্থ্য” শীর্ষক এক রাউন্ডটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ আরবান হেলথ নেটওয়ার্ক এ গোলটেবিলের আয়োজন করে।


সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. সাফিকুল ইসলাম খান, ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ড. মালালা আহমাদজাই, চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল। সভা সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেননূর।


স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির উদাহরণ টেনে বলেন, “রানা প্লাজা ছিল মাত্র একটি ১০ তলা ভবন। সেই একটি ভবন ধসের পর আমরা দেখেছি এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং আড়াই হাজার মানুষের আহত হওয়ার ভয়াবহ চিত্র। আল্লাহ না করুন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটিতে যদি এমন ১০০ বা ২০০ ভবন ধসে পড়ে, তবে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে তা কল্পনাও করা কঠিন।”


তিনি আরও বলেন, ঢাকা দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের কেন্দ্রবিন্দু। ভূমিকম্পে এখানকার হাসপাতালগুলো ধসে পড়তে পারে, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।


দুর্যোগকালীন দায়িত্বের আইনি অস্পষ্টতা দূর করার ওপর জোর দিয়ে প্রতিমন্ত্রী ড. মুহিত বলেন, আমাদের যে দুর্যোগ আইন রয়েছে, তা পর্যালোচনা করা উচিত। এই খাতে কর্মরত আইনবিদ, জনস্বাস্থ্যবিদ এবং প্রকৌশলীরা একত্রে বসে যদি আইনটি হালনাগাদ করার সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তৈরি করেন, তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার তা বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নেবে।


এ সময় তিনি জরুরি চিকিৎসা-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমাজকল্যাণ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর তাগিদ দেন।


দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মানসিক স্বাস্থ্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দুর্যোগে মানুষ শুধু শারীরিকভাবেই আহত হয় না, মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকরাও তীব্র মানসিক ট্রমার শিকার হন। আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনায় এই সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে, যা যুক্ত করা জরুরি।


তিনি ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় লক্ষ লক্ষ তরুণকে সম্পৃক্ত করে ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’ গঠন এবং তাদের পেশাদার প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন।


আন্তর্জাতিক দুর্যোগ গবেষণা হাব হওয়ার সম্ভাবনা সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ড. এম. এ. মুহিত জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই গাজীপুরে ‘ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ’ চালু করা হয়েছে।


দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রামীণ বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আরও বেশি ফিল্ড রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলা দরকার। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি ‘হাব’ হয়ে উঠতে পারে এবং অন্যান্য দেশ আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারবে।


অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ইমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ আরবান হেলথ নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব ড. শামিম হায়দার তালুকদার। তিনি জলবায়ুজনিত ঝুঁকি ও দুর্বলতা মোকাবিলায় সমন্বিত নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জোরদারের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সভাপতি ড. তাহমিদ মালিক আল-হুসাইনি। তিনি নগর পরিকল্পনা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জনস্বাস্থ্য সহনশীলতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেন।


আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন তাপমাত্রাজনিত চাপ, নগর পরিবেশগত ঝুঁকি, জরুরি প্রস্তুতি, পানিবাহিত রোগ, বায়ুদূষণ, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়, যা বিশেষ করে নগর দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। অংশগ্রহণকারীরা প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা, আন্তঃখাত সমন্বয় জোরদার এবং সহনশীল নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।


সম্পর্কিত খবর