আন্তর্জাতিক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পর পাকিস্তান সফরে ইরানের প্রেসিডেন্ট

একদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আজ মঙ্গলবার পাকিস্তান যাচ্ছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পর এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলও রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। সেই সংঘাতের পর চলতি মাসের শুরুতে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক-এ মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এই সফরটি হচ্ছে।
পাকিস্তান এই সংঘাতের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। তারা গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এরপর ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ব্যবস্থা করে। ওয়াশিংটন, তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রাখে।
সফরকে সামনে রেখে ইসলামাবাদ পুলিশ এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘মধ্যরাত থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেকোনো দিক বা মহাসড়ক থেকে ইসলামাবাদে সব ধরনের ভারী যানবাহন প্রবেশ স্থগিত থাকবে।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘ম্যারিয়ট ও মার্গাল্লা রোডের প্রবেশপথ ছাড়া রেড জোনের অন্য সব প্রবেশপথ সব ধরনের যান চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।’
এদিকে পাকিস্তানের ক্যাবিনেট ডিভিশন ইসলামাবাদের রেড জোনে অবস্থিত মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য সরকারি কার্যালয়কে মঙ্গলবার বাসা থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নির্দেশনার বাইরে রাখা হয়েছে।
এই সফরে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় সফরকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন।
সোমবার এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ‘সফরকালে দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব দিক পর্যালোচনা করবে। তারা বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত নিরাপত্তা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার নতুন উপায় খুঁজবে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই সফরটি ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করার একটি সুযোগ সৃষ্টি করবে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেজেশকিয়ানের এটি দ্বিতীয় পাকিস্তান সফর। ২০২৫ সালের আগস্টে তাঁর প্রথম সফরের সময় দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে সমন্বয় জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা কেবল তেহরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ায়নি, বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে।
গত রোববার বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইসলামাবাদ চুক্তির কাঠামোর অধীনে প্রথমবারের মতো মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা একত্রিত হন। বৈঠকের পর পাকিস্তান ও কাতার-এর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, পক্ষগুলো ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের পাশাপাশি এই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির উপস্থিত ছিলেন।
পেজেশকিয়ানের সফরের আগে ইরানি ও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার তেহরান সফরকালে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট কূটনীতিতে সমর্থন এবং যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে সংঘাত অবসানের প্রচেষ্টার জন্য ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে তেহরানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। যদিও অভিন্ন সীমান্তে নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জের কারণে সময়-সময় এই সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উভয় দেশই বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার চেষ্টা করছে।







