ক্যাম্পাস
জাবিতে পলাশী থেকে বাংলাদেশ বিষয়ক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)'র উদ্দ্যোগে ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ: ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানটির প্রধান আলোচক হিসেবে দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সেমিনার কক্ষে জাকসুর সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বাপ্পির সঞ্চালনায় আলোচনা সভাটি পরিচালিত হয়।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান পলাশীর যুদ্ধকে কেবল একটি সামরিক পরাজয় হিসেবে না দেখে; এটিকে বাংলার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারানোর সূচনা হিসেবেও দেখেন।
তিনি বলেন, ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার সম্পদ লুণ্ঠনের বৈধ অধিকার পায় এবং এর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলার বিপুল জনগোষ্ঠী প্রাণ হারায়। তাই ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়। জাতীয় ঐক্য নষ্ট হলে বিদেশি শক্তি সেই সুযোগ কাজে লাগায়।
১৯৪৭ ও ১৯৭১ উভয় ঘটনাই বাংলাদেশের ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিহাসকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, সত্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে ব্রিটিশদের ছড়ানো নানা অপপ্রচার ও চরিত্রহননের বিষয়গুলো নতুন করে গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ বিষয়ে একাডেমিক গবেষণা পরিচালনারও পরামর্শ দেন।
এসময় বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত ঐক্য যেন কোনোভাবেই বিভক্ত না হয়। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো এমন পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়, যাতে পরাজিত ফ্যাসিবাদ বা কোনো অশুভ শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পায়। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করার আহ্বান জানান এবং বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, পলাশীর যুদ্ধ কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল আমাদের স্বাধীনতা হারিয়ে দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসনের সূচনা। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিগত লোভ, ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা কখনোই রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়। মীর জাফর, জগৎশেঠ কিংবা সে সময়ের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মতো আজও যদি দেশীয় স্বার্থগোষ্ঠী বিদেশি শক্তির সঙ্গে নিজেদের স্বার্থে আপস করে, তবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আমি উপলব্ধি করেছি, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্য থেকেই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য করতে এসে একসময় পুরো রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করেছিল। আজও বিশ্বরাজনীতিতে একই বাস্তবতা ভিন্ন রূপে বিদ্যমান। উন্নয়ন, বিনিয়োগ কিংবা ঋণের আড়ালেও নতুন ধরনের উপনিবেশবাদ কাজ করতে পারে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সততা, দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এসময় তিনি আরও বলেন, “বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না; অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার ও বিভাজনের রাজনীতির মাধ্যমেও যুদ্ধ পরিচালিত হয়। তাই আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে, যেন কোনো দেশীয় বা বিদেশি ষড়যন্ত্র আমাদের বিভক্ত করতে না পারে। যারা জীবন দিয়ে স্বাধীনতা ও গণঅভ্যুত্থানকে সফল করেছেন, তাঁদের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমাদের সততা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করতে হবে। আমরা উন্নয়ন চাই, সমৃদ্ধি চাই; তবে কখনোই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়।
আয়োজনটিতে বিশেষ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. খোন্দকার লুৎফুল এলাহী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ হোসেন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. সালাহউদ্দীন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু। এছাড়াও জাকসু জিএস মাজহারুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতৃত্ববৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে সভা সমাপ্ত হয়।







