খেলাধুলা
পেলের ‘নান্দনিক ফুটবল’ এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
ছবি : সংগৃহীত
"তারা সুন্দর ফুটবলের তোয়াক্কা করে না, ফুটবলের নান্দনিকতা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। আমাদের সময়ে আমরা মাঠে ভাবতাম এবং দর্শকদের কিছুটা বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করতাম।"
২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের আগে ফুটবলের কালো মানিক পেলের এই একটি উক্তিই বদলে যাওয়া আধুনিক ফুটবলের করপোরেট বাস্তবতার সবচেয়ে বড় সত্য। সেই বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে সুন্দর ফুটবলের পসরা সাজাতে চাওয়া ব্রাজিলকে সেমিফাইনালে জার্মানির নির্মম, যান্ত্রিক এবং কঠোর ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছিল। সেই দিনই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল, ফুটবল এখন আর ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বা বিনোদনের মঞ্চ নয়; এটি এখন যেকোনো মূল্যে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার এক গাণিতিক যুদ্ধ।
২০২৬ সালে এসে এই "সর্বজনীন খেলা" সাধারণ সমর্থকদের থেকে আরও বেশি দূরে সরে গেছে। যে ফুটবল একসময় শ্রমজীবী মানুষের সস্তা বিনোদন আর মুক্তির আনন্দ ছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে পুঁজিপতিদের বিলাসী যাপনে।
ফুটবল ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপজয়ী পেলে-টোস্টাওদের ব্রাজিল দলটিই ছিল নান্দনিক বা ‘সুন্দর ফুটবল’ খেলে বিশ্বজয়ী শেষ দল। ১৯৭৪ সালে জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ফুটবলের খোলনলচে বদলে যেতে শুরু করে।
মাঠে নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুইফের প্রবর্তিত ‘টোটাল ফুটবল’ (কোনো নির্দিষ্ট পজিশন ছাড়া অল-আউট আক্রমণ) কিংবা ১৯৮২ সালের সক্রেটিস-জিকো-এদারের ব্রাজিল বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করলেও ট্রফি জিততে পারেনি; জিতেছিল ইতালির মতো রক্ষণাত্মক ও বাস্তববাদী দলগুলো। কারণ ততদিনে এডিডাস এবং কোকা-কোলার মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো ফিফার স্থায়ী বাণিজ্যিক পার্টনার হয়ে উঠেছে। ১৯৮০-এর দশকে স্পোর্টস কেবল টিভির আগমনে সম্প্রচার স্বত্বের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করে এবং ফুটবলের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়- যেভাবেই হোক জিততে হবে।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ১৯৯০ সালের তুলনায় টিকিটের দাম বেড়েছে প্রায় ৮০০ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিফার এই বাণিজ্যিকীকরণ আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপে। ৪৮ দলের এই বর্ধিত আসর থেকে ফিফা প্রায় ৯ বিলিয়ন (৯০০ কোটি) ডলার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার বড় একটা অংশ আসছে সমর্থকদের পকেট কেটে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ১৯৯৪ সালে শেষবার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তখন ফাইনাল ম্যাচের ক্যাটাগরি-১ টিকিটের দাম ছিল ৪৭৫ ডলার (যা ২০২৬ সালের মুদ্রাস্ফীতি অনুযায়ী ১,০৭৪.৪৫ ডলার হওয়ার কথা)। কিন্তু কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিটের দাম বেড়েছে রেকর্ড ৬০০ শতাংশ। ২০২২ সালে ক্যাটাগরি-১ টিকিটের দাম যেখানে ছিল ১,৮৩৩.৯১ ডলার, ২০২৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০,৯৯০ ডলারে। বর্তমানে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দামও ৬০ থেকে ১০,০০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে, যার কারণে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখা এখন কেবল ধনকুবেরদের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
ফিফা ম্যাচ সংখ্যা বাড়িয়ে বিজ্ঞাপন এবং স্পন্সরশিপের টাকা কামানোর জন্য টুর্নামেন্ট ৪৮ দলে রূপান্তর করলেও, এর একটি ইতিবাচক দিকও আলো ছড়িয়েছে। এর ফলে বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ পেয়েছে ছোট ছোট দেশগুলো।
এবারের বিশ্বকাপে সব আলো কেড়ে নিয়েছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে এসেই স্পেন ও উরুগুয়ের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের গ্রুপে চমক দেখিয়ে তারা নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিলেও, তারা প্রমাণ করেছে যে কোটি কোটি ডলারের ভিড়েও ফুটবলের আদি ও অকৃত্রিম সৌন্দর্য এখনো হারিয়ে যায়নি। সাধারণ মানুষের আবেগ আর মাঠের লড়াইয়ে ফুটবল এখনো তার নিজের নিয়মেই সুন্দর।
সূত্র: আল জাজিরা







