ক্যাম্পাস
ব্যর্থতা থেকে স্বপ্ন জয়, যবিপ্রবির MEXT স্কলারশিপজয়ী শাহিনুর রহমানের সংগ্রামের গল্প

ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক, একের পর এক ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টাকে শক্তিতে রূপ দিয়ে জাপান সরকারের মর্যাদাপূর্ণ মেক্সট (মিনিস্ট্রি অব এডুকেশন, কালচার, স্পোর্টস, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি) স্কলারশিপ অর্জন করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর ও শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম ব্যাচের (২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী মো. শাহিনুর রহমান। দীর্ঘ সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে অর্জিত এই সাফল্যের গল্প তিনি তুলে ধরেছেন নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সময়।
নিজের প্রস্তুতি ও দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মো. শাহিনুর রহমান বলেন, "আমার পথচলার শুরু ২০১১ সালে। তবে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেয়েছি ব্যর্থতা থেকে। অনার্সে ৩.৬৫/৪ সিজিপিএ, ডিন'স অ্যাওয়ার্ড অর্জনের পরও মাস্টার্সের ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায়, সেদিন আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেদিনই নিজের কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে যদি জীবনে আবার উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করি, তবে প্রথমেই দেশের বাইরে একটি সম্পূর্ণ অর্থায়নপ্রাপ্ত (Fully Funded) মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করব। এরপর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছি বোন,মা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন, মাস্টার্সের থিসিস করার সুযোগ পাইনি, ২০১৮ সালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি পরীক্ষায় জীবনের সবচেয়ে ভালো পরীক্ষা দিয়েও কাঙ্খিত ফলাফল পাইনি। কিন্তু আমি সাময়িকভাবে আহত হলেও সকল ব্যর্থতা,অপূর্ণতা ভুলে আরও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ানো চেষ্টা করেছি কারণ এই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আমার না-পাওয়ার কষ্ট, অপূর্ণতা, আত্মসম্মানের প্রশ্ন এবং নিজেকে প্রমাণ করার এক অদম্য ইচ্ছা।
তিনি আরও বলেন, "কর্মজীবনের পাশাপাশি আমি নিজের প্রস্তুতি কখনো থামাইনি। প্রতিদিন নতুন কিছু শিখেছি, গবেষণায় দক্ষতা বাড়িয়েছি এবং নিজের স্বপ্নের দিকে এক ধাপ করে এগিয়েছি। আইইএলটিএস-এর কাঙ্ক্ষিত স্কোর অর্জন করতে প্রায় দুই বছর লেগেছে। বারবার ব্যর্থ হয়েছি, কিন্তু কখনো চেষ্টা থামাইনি। মেক্সট স্কলারশিপ-ও প্রথম কিংবা দ্বিতীয় চেষ্টায় আসেনি। দ্বিতীয়বার সেলফ-ফান্ডেড অ্যাডমিশন পেয়েছিলাম। অনেকেই হয়তো সেখানেই থেমে যেতেন। কিন্তু আমি জানতাম, আমার লক্ষ্য আরও বড়। অবশেষে তৃতীয় প্রচেষ্টায় অর্জন করি সম্পূর্ণ অর্থায়নপ্রাপ্ত মেক্সট স্কলারশিপ। আমি একজন কৃষকের সন্তান। এই পরিচয় আমার কাছে গর্বের। ছোটবেলা থেকেই শিখেছি পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। তাই জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে নিজেকে বলেছি, ‘হারার আগে কখনো হার মেনে নেব না।’
নিজের সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই দীর্ঘ যাত্রায় একজন মানুষের অবদান সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যিনি নিঃস্বার্থভাবে প্রতিটি সংগ্রামে পাশে থেকেছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং ভেঙে পড়লে আবার দাঁড় করিয়েছেন, তিনি আমার প্রিয় সহধর্মিণী। তিনিও জাপানে এডিবি স্কলারশিপ-এর আওতায় উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্য ও অনুপ্রেরণা ছাড়া আমার এই পথচলা এতদূর পৌঁছানো সম্ভব হতো না। তাঁর প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। আমার স্বপ্ন শুধু নিজের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমি চাই বাংলাদেশের ক্রীড়া বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে নিতে কাজ করতে। এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা ক্রীড়া বিজ্ঞানে বিশ্বমানের পেশাদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে দেশের সুনাম বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেবে।
অনুজদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, "নিজের স্বপ্নকে কখনো ছোট করে দেখো না। দারিদ্র্য, ব্যর্থতা কিংবা সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। স্বপ্ন দেখো, কঠোর পরিশ্রম করো এবং ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করো। সাফল্য একদিন অবশ্যই ধরা দেবে।”







