জাতীয়
ট্রান্সকমের সিমিন ও তাঁর মাকে অব্যাহতি, মামলা থেকে মুক্তি ছয়জনের

ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সিইও সিমিন রহমান ও তাঁর মা মিসেস শাহনাজ রহমানসহ ছয় আসামিকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মতো পর্যাপ্ত উপাদান পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
মামলার অপর আসামিরা হলেন—ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক, আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক ও সামসুজ্জামান পাটোয়ারী। এদিন জামিনে থাকা আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁদের উপস্থিতিতেই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী এবং বাদীপক্ষের আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার অভিযোগ গঠনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁরা বলেন, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় রেকর্ডকৃত জবানবন্দিতে জালিয়াতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হতে পারে—এমন যুক্তিতে তাঁরা অভিযোগ গঠনের আবেদন জানান।
অন্যদিকে আসামিপক্ষে আইনজীবী মহসিন মিয়া, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ঢাকা বার ইউনিটের আহ্বায়ক খোরশেদ আলম এবং ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি খোরশেদ মিয়া আলম আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করেন। তাঁদের বক্তব্য, অভিযোগ গঠনের মতো কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। অভিযোগ গঠন করা হলে পরবর্তীতে আসামিরা খালাস পাবেন, যা রাষ্ট্রের সময়ের অপচয় হবে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন, যেখানে সিমিন রহমানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকায় একটি বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয় বলে দেখানো হয়। সভার এজেন্ডায় ছিল—পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্ত অনুমোদন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের অনুমোদন, এবং লতিফুর রহমান কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন।
হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হয়। একইভাবে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও অভিযোগ অনুযায়ী, সভার সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন। ওই সভার তৃতীয় এজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে ১৪ হাজার ১৬০টি সিমিন রহমান, ৪ হাজার ৭২০টি আরশাদ ওয়ালিউর রহমান এবং ৪ হাজার ৭২০টি শাযরেহ হকের নামে হস্তান্তর করা হয়।
তবে বাদী শাযরেহ হক দাবি করেন, ২০২০ সালের ১৩ জুন এ ধরনের কোনো বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য বলা হলেও আসামিপক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া সভার পূর্বে কোনো ই-মেইল বা ডাকযোগে নোটিশ পাঠানোর প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র ২০২০ সালের ১৩ জুন আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়। যদিও শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয় ১৭ আগস্ট, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফি পরিশোধ না করে ২ সেপ্টেম্বর তা পরিশোধ করা হয়। এতে প্রক্রিয়াগত অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
এছাড়া শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা কেউই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। নিয়ম অনুযায়ী উভয় পক্ষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে প্রতিনিধির সামনে স্বাক্ষর করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি, যা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার লঙ্ঘন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
চার্জশিটে আরও বলা হয়, সিমিন রহমান দুটি ভুয়া স্ট্যাম্প এফিডেভিট ব্যবহার করে ছোট বোন শাযরেহ হকসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর সংযুক্ত করে শেয়ার হস্তান্তরের দলিল তৈরি করেন এবং তা আরজেএসসিতে দাখিল করেন। শাযরেহ হকের নামে ব্যবহৃত একটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে সৃজিত বলে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দাখিল করা ডাক বিভাগ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যে ভেন্ডরের মাধ্যমে স্ট্যাম্প দুটি সরবরাহ করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে, তাঁর লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল করা হয়। পরে তিনি ২০২৩ সালের স্ট্যাম্প অসদুপায়ে সংগ্রহ করে ২০২০ সালের ৩ মার্চ তারিখে সরবরাহ দেখান।








