ক্যাম্পাস
ঈদের আনন্দে স্মৃতি, ভালোবাসা ও মানবতার ছোঁয়া: গোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা

ঈদুল ফিতর মুসলিমদের সবচেয়ে আনন্দের উৎসবগুলোর একটি। এক মাস রোজা রাখার পর এই দিনটি আসে আনন্দ, ভালোবাসা আর মিলনের বার্তা নিয়ে। নতুন পোশাক, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, গ্রামের বাড়িতে ফেরা আর শৈশবের স্মৃতিতে ডুবে থাকা—সব মিলিয়ে ঈদ মানেই অন্যরকম এক অনুভূতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার ব্যস্ততার মাঝেও শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য অপেক্ষা করে, কেউ আবার শৈশবের স্মৃতি মনে করে আবেগী হয়ে ওঠে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা তুলে ধরেছেন মো. রেজাউল করিম।
“পরিস্থিতি যাই হোক, ঈদের আনন্দ অটুট”
এ বছর যেন ঈদ এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। চারদিকে যুদ্ধ-বিগ্রহ, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি। তবুও ঈদ যে ঈদ—ঈদ মানেই খুশি। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ যেন আমাদের জীবনে আনন্দের নতুন মাত্রা যোগ করে। ছোটবেলার মতো ঈদের ১৫ দিন আগে থেকে দিন গণনা না করলেও, রোজার শেষ মুহূর্তে ঈদের অপেক্ষা করি সেই আগের দিনের মতোই।
ঈদের দিন বাবা-মা, কাকা-কাকিদের কাছ থেকে সালামি নেওয়া শৈশব থেকে আমার একটি ট্রেন্ড হয়ে গেছে। পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদের নামাজ পড়ার চিন্তায় মন ভরে যায়। নামাজ শেষে মায়ের হাতের সেমাই খাওয়া এক অন্যরকম অনুভূতি। এরপর দাদা-দাদির কবর জিয়ারত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একদিন আমরাও আল্লাহর কাছে ফিরে যাব। আর ঈদের দিন ঘুরতে যাওয়া আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে তোলে।
মো. আলিমুল ইসলাম আরিফুল
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ঈদের ছুটিতে ভার্সিটি থেকে বাড়িতে ফেরার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম—একটা আলাদা শান্তি, আনন্দ আর ভালোবাসায় ভরা। দীর্ঘদিন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর ব্যস্ততার মাঝে ডুবে থাকার পর যখন বাড়ির পথে যাত্রা শুরু হয়, তখন মনটা যেন হালকা হয়ে যায়। বাসা কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে জমতে থাকে অদ্ভুত এক উত্তেজনা—প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হবে, মায়ের হাতের রান্না খাওয়া হবে, পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হবে।
বাড়িতে পৌঁছানোর পর সেই পরিচিত পরিবেশ, পরিবারের হাসিমুখ, ছোট ভাই-বোনদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে মনে হয়, এটাই আসল সুখ। ঈদের নামাজ, সেমাই, কোলাকুলি—সবকিছু যেন আরও বেশি অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন নিজের মানুষদের পাশে পাওয়া যায়।
ভার্সিটির ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এই ছোট্ট ছুটিটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যত দূরেই যাই না কেন, বাড়িই আমাদের আসল ঠিকানা। আর ঈদ মানেই পরিবারকে ঘিরে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো।
মো. ইব্রাহীম হোসেন
পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
“সম্পর্কই ঈদের আসল সৌন্দর্য”
ঈদ মানেই শুধু একটি উৎসব নয়—এটি এক ধরনের অনুভূতি, যা মনকে শান্তি ও আনন্দে ভরিয়ে দেয়। ঈদের আসল সৌন্দর্য নতুন জামা বা ভালো খাবারে নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে। সারা বছরের ব্যস্ততা, দূরত্ব, অভিমান—সবকিছু যেন ঈদের দিনে নরম হয়ে যায়। এক প্লেট সেমাই, এক কাপ চা আর কিছু আন্তরিক হাসি—এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই ঈদকে বড় করে তোলে।
আমার কাছে ঈদ মানে—
একটি নতুন শুরুর সুযোগ,
মনের সব কষ্ট মুছে ফেলার দিন,
আর প্রিয় মানুষদের কাছে ফিরে যাওয়ার সময়।
ফয়সাল মাহমুদ
পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
“কৃতজ্ঞতা ও ভাগাভাগির দিন”
ঈদুল ফিতর আমার কাছে আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার একটি বিশেষ দিন। এক মাস রোজার পর যখন ঈদের চাঁদ দেখা যায়, তখন মনে হয় আল্লাহ আমাদের ধৈর্য ও সংযমের পুরস্কার দিচ্ছেন। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিখিয়েছেন—ঈদের আসল সৌন্দর্য হলো আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। তাই এই দিনে গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত খুশি।
আমার কাছে ঈদে সালামি পাওয়াটা যেমন আনন্দের, তেমনি ছোটদের সালামি দেওয়াটাও অনেক ভালো লাগে। নতুন জামা, পাঞ্জাবি, মায়ের হাতের সেমাই-পায়েস আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হলো—সবার সঙ্গে একসঙ্গে ঈদের মাঠে যাওয়া, নামাজ পড়া এবং নামাজ শেষে কোলাকুলি করা।
জুবায়ের
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
“শৈশবের ঈদ—স্মৃতির রঙিন বাক্স”
ছোটবেলার ঈদ ছিল অন্যরকম—আনন্দ আর অনুভূতিগুলো ছিল অনেক আলাদা। মনের ভেতর একটি রঙিন বাক্স আছে, যেখানে বন্দি করে রেখেছি অনেক স্মৃতি ও অনুভূতি। মাঝে মাঝে সেই স্মৃতির পাতা উল্টে দেখি—যার তুলনা অন্য কিছুর সঙ্গে হয় না।
বয়স তখন ৬ বা ৭। ঈদের জামা কাউকে দেখালে মনে হতো ঈদ পুরোনো হয়ে যাবে। তবুও কাছের বন্ধুরা লুকিয়ে জামা দেখাত, আমিও দেখাতাম। চাঁদরাতে চাঁদ খোঁজা, খবর শুনে আনন্দে মেতে ওঠা, বাজি ফাটানো, একসঙ্গে মেহেদি দেওয়া—সবকিছুই ছিল অন্যরকম।
ঈদের সকালে উঠে প্রথম কাজ ছিল কার হাতের মেহেদি গাঢ় হয়েছে তা দেখা। এরপর নতুন জামা পরে বড়দের সালাম করে সালামি নেওয়া—যার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবকিছু যেন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। আগের মতো ঈদের আনন্দ আর পাই না।
এখন ছোটদের আনন্দ দেখে, তাদের সালামি দিয়ে, আর বোনদের মেহেদি দিতে দেখে সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে আসে—যেগুলোই আমাকে ভালো রাখে।
সৈয়দা ফারজানা ইয়াসমিন বর্ষা
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনের মাঝে—অ্যাসাইনমেন্ট, ল্যাব প্র্যাকটিক্যাল, ক্লাস আর নানা চাপের ভিড়ে—ঈদ যেন এক টুকরো শান্তি। আমি একজন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে যখন ছুটিতে বাসায় ফিরি, তখন মনে হয় নিজের আপন ঠিকানায় ফিরে এসেছি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, মায়ের হাতের রান্না আর সবার হাসিমুখ—সব মিলিয়ে ঈদ হয়ে ওঠে সত্যিই বিশেষ।
ঈদের সকালটা ভরে থাকে এক অন্যরকম প্রশান্তিতে। নামাজ আদায়, একসঙ্গে বসে খাওয়া আর প্রিয়জনদের সঙ্গে ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আনন্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে আমরা দায়িত্ব আর সময়ের মূল্য শিখি, কিন্তু ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা আর সম্পর্কই জীবনের আসল সম্পদ।
আমার কাছে ঈদ মানে শুধু উৎসব নয়, বরং নতুন করে শক্তি পাওয়া এবং নিজের মানুষদের কাছে ফিরে পাওয়ার এক গভীর অনুভূতি।
নিশাদ হাসান
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগ







