আন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ফেরার পথ খুলছে

ডেস্ক

শেয়ারঃ

যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ফেরার পথ খুলছে- খবরের থাম্বনেইল ফটো

দক্ষিণ লেবানন থেকে পালিয়ে যাওয়া শত শত মানুষের সঙ্গে আমানি আতরাশ ও তার পরিবার শুক্রবার সকালেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন কাসমিয়াহ সেতুটি পুনরায় চালু হওয়ার জন্য।


যুদ্ধবিরতি শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরাইল ওই সেতুতে বোমা হামলা চালায়।


ইসরাইল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া লাখো মানুষের মতো তার পরিবারও নিজ ঘরে ফেরার আশায় ছিল—যদিও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ, লেবাননের কর্মকর্তারা এবং ইসরাইলি সেনাবাহিনী দক্ষিণে না ফেরার সতর্কবার্তা দিয়ে আসছে।


ওই অঞ্চলের কিছু অংশ এখনও ইসরাইলের দখলে রয়েছে।


তাইর থেকে এএফপি জানায়, ৩৭ বছর বয়সী আতরাশ বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক ঘণ্টা আগে আমরা রওনা দিই, যাতে সেতুটি খুললে দ্রুত আমাদের শহরে ফিরতে পারি।’


টাইর শহরের উত্তর-পূর্বে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারিতে বসে তিনি এএফপিকে বলেন, ‘অপেক্ষাটা খুব কঠিন, কারণ আমরা যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পৌঁছাতে চাই।’


লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি মধ্যরাতে কার্যকর হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন।


মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে ২ মার্চ এই সংঘাতের সূচনা হয়। এর জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা ও দক্ষিণে স্থল অভিযান চালায়।


লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ যুদ্ধে ২ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে—বিশেষ করে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহ-ঘাঁটি এলাকা থেকে।


আত্রাশ বলেন, ‘আমাদের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—গর্ব ও বিজয়ের অনুভূতি।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে।


তিনি বলেন, ‘আমাদের ভূমিতে কোনো ইসরাইলি সেনা থাকতে পারে না। তারা সরে যেতে হবে, যাতে আমরা শান্তিতে থাকতে পারি।’ একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরাইল যদি ওই এলাকায় সেনা মোতায়েন রাখে, তাহলে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে।


ওই এলাকায় ১০ কিলোমিটার ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।


‘আমি তাঁবু খাটিয়ে থাকব’

যুদ্ধবিরতির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরাইলি বোমা হামলায় লিতানি নদীর ওপর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল কাসমিয়েহ সেতুটি ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে দক্ষিণাঞ্চল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।


লেবাননের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তিনটি বুলডোজার ভোর থেকে গর্ত ভরাটের কাজ শুরু করে। সেতুটি চলাচলের উপযোগী হতেই প্রথমে মোটরসাইকেল, পরে গাড়ি একে একে পার হতে থাকে।


অনেকেই হর্ন বাজিয়ে উদযাপন করেন এবং হলুদ হিজবুল্লাহ পতাকা ওড়ান।


সকাল ৯টার মধ্যে সাইদা ও টাইর শহরকে সংযুক্ত করা মহাসড়কে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।


হাজার হাজার গাড়ি দক্ষিণে ছুটে যায়, অনেকের গাড়িতে গদি, রান্নার সামগ্রী ও কম্বল বোঝাই ছিল।


অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষই জানতেন না, ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে তাদের বাড়িঘরের কী অবস্থা হয়েছে।


এদের একজন গুফরান হামজেহ, যিনি বৈরুত থেকে এসে তার ছেলেকে নিয়ে সেতুর কাছে অপেক্ষা করছিলেন।


তিনি বলেন, ‘যখন আমরা পালিয়েছিলাম, তখন রাস্তায় ১৬ ঘণ্টা লেগেছিল। আজও প্রায় একই সময় লাগছে। কিন্তু সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমরা আমাদের গ্রাম ও ভূমিতে ফিরে যাচ্ছি।’


তিনি আরও বলেন, ‘আমার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে কি না, জানি না। যদি ধ্বংসও হয়ে থাকে, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি সেখানে তাঁবু খাটিয়ে থাকব।’


‘যে মূল্য আমাদের নয়’

সেতুর ধ্বংসাবশেষের পাশে বসে থাকা তিন সন্তানের জনক মোহাম্মদ আবু রায়া একই অনুভূতির কথা জানান।


তিনি বলেন, ‘গোলাবর্ষণের মধ্যেও আমরা বিজয়ী হয়ে ঘরে ফিরছি, আলহামদুলিল্লাহ। ঘরে ফিরতে পারার আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না, ঘর না থাকলেও সমস্যা নেই। আমরা আমাদের ভূমিতে ফিরে এসেছি, এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।’


সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লিতানি নদীর ওপর আরও অনেক সেতুতে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। তাদের অভিযোগ, এসব সেতু দিয়ে হিজবুল্লাহ অস্ত্র ও যোদ্ধা পরিবহন করে।


৭৭ বছর বয়সী তামের আবদেল লতিফ হামজা দীর্ঘদিন বাস্তুচ্যুত থাকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ১০ দিন সমুদ্রতীরে কাটিয়েছি। কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি, সাহায্যও করেনি। আমাদের সব ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, কিছুই অবশিষ্ট নেই।’


তিনি বলেন, ‘৫০ দিন আগে আমরা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলাম। আজ মনে হচ্ছে আমরা ইসরাইলের শত্রু হতে চাই না। আমরা এমন একটি মূল্য দিচ্ছি, যা আমাদের নয়।’


সম্পর্কিত খবর