আন্তর্জাতিক
ইরান নিয়ে অনিশ্চিত আলোচনায় পাকিস্তানে যাচ্ছেন মার্কিন দূতরা

নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যে ইরানের সঙ্গে নতুন দফার শান্তি আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে মার্কিন দূতরা শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। তবে সরাসরি আলোচনা হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইসলামাবাদ থেকে এএফপি জানায়, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে 'সরাসরি বৈঠকে' অংশ নেবেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সরাসরি আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুক্রবার ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার লেবাননে তিন সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও শুক্রবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ট্রাম্প লেবাননে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর চাপও বাড়ছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, উইটকফ ও কুশনার শনিবার পাকিস্তানে যাচ্ছেন 'ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা' করতে।
তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট যেমনটি চেয়েছিলেন, ইরানিরা যোগাযোগ করেছে এবং এই সরাসরি বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, এই আলোচনা 'সম্ভবত একটি চুক্তির দিকে অগ্রগতিতে সহায়তা করবে।'
লেভিট জানান, দুই সপ্তাহ আগে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আপাতত যাচ্ছেন না, তবে প্রয়োজন হলে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন।
তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি, ইরানি পক্ষ সরাসরি মার্কিন দূতদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে কি না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো পরিকল্পনা নেই। ইসলামাবাদ কেবল সংঘাত অবসানে ইরানের প্রস্তাব 'পৌঁছে দেওয়ার' একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরাঘচি 'আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চলমান প্রচেষ্টা' নিয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে ইসলামাবাদে এসেছেন। তবে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
একজন ইরানি মুখপাত্র জানান, পাকিস্তান সফরের পর আরাঘচি ওমান ও রাশিয়া সফর করবেন। সেখানে তিনি ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করবেন।
হরমুজ খুলে দেওয়াকে ‘অত্যাবশ্যক’ : ইউরোপীয় ইউনিয়ন
গত দফার আলোচনার পর দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানোর প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়ে। কারণ ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্দর অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনায় অংশ নেবে না।
ইরানও কার্যত হরমুজ প্রণালীতে নিজস্ব অবরোধ আরোপ করেছে। কেবল অল্প কিছু জাহাজকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।
নতুন শান্তি আলোচনার আশায় শুক্রবার তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা শুক্রবার বলেন, হরমুজ প্রণালী 'তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিধিনিষেধ ও টোল ছাড়া খুলে দিতে হবে।'
তিনি বলেন, 'এটি পুরো বিশ্বের জন্য অত্যাবশ্যক।'
ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো শুক্রবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে করপোরেট আয়ের প্রতিবেদন এবং মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের পাকিস্তানমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অঞ্চলটিতে পৌঁছেছে তাদের তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ।
'ধ্বংস হয়ে গেছে’
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার লেবাননে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি ইসরাইল ও লেবাননের দূতদের সঙ্গে বৈঠকের পর আশা প্রকাশ করেন যে, শিগগিরই দুই দেশের নেতাদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে।
ইসরাইল ও লেবানন কয়েক দশক ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে রয়েছে এবং গত সপ্তাহের আগে ১৯৯৩ সালের পর এত সরাসরি বৈঠকে বসেনি।
হিজবুল্লাহর পার্লামেন্টারি ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ লেবানন সরকারকে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প যে ধরনের স্থায়ী শান্তি চুক্তি চাইছেন, তা 'কোনোভাবেই লেবাননের জাতীয় ঐকমত্য পাবে না।'
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, যিনি ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার অঙ্গীকার করেছেন, বলেন, 'আমরা ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তির পথে যাত্রা শুরু করেছি এবং পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছি যে হিজবুল্লাহ এটি নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে।'
দক্ষিণ লেবাননের টাইর শহরে মোহাম্মদ আলি হিজাজি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক মিনিট আগে ইসরাইলি হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচিহ্ন খুঁজছিলেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে।
৪৮ বছর বয়সী হিজাজি বলেন, 'আমি আমার মায়ের চুলের ব্রাশ.. আর তার প্রিয় সুগন্ধির বোতলটি খুঁজছি।' তিনি জানান, ফ্রান্স থেকে তিনি এগুলো মাকে পাঠিয়েছিলেন, সেখানে তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন।
কান্না চেপে রেখে তিনি এএফপিকে বলেন, 'আমার জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। পাঁচ দিন ধরে আমি ঘুমাতে পারিনি।'







