এক্সক্লুসিভ
গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার রঙে সেজেছে জবি

পুরান ঢাকার ব্যস্ত অলিগলি আর যানজটের কোলাহল ছাপিয়ে গ্রীষ্মের বার্তা দিচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসের রক্তিম কৃষ্ণচূড়া। সবুজের বুক চিরে জেগে ওঠা এই লাল আভা যেন পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে পরিণত করেছে এক উন্মুক্ত বাগানে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কৃষ্ণচূড়া গাছ এখন এক একটি জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে প্রকৃতি আপন মনে এঁকে দিয়েছে তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম।
শোভাবর্ধক এই কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Delonix regia, যা ফ্যাবেসি পরিবারের অন্তর্গত। উষ্ণ বা প্রায়-উষ্ণ আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা এই গাছ শুষ্ক ও লবণাক্ত অবস্থা অনায়াসেই সহ্য করতে পারে। বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটার প্রধান সময়।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, এই গাছের আদিনিবাস মাদাগাস্কারে হলেও সেখানে এটি এখন বিলুপ্তপ্রায়। অনেকের কাছে এটি ‘গুলমোহর’ নামে পরিচিত। লোকমুখে প্রচলিত আছে, রাধা ও কৃষ্ণের নাম মিলিয়ে এই ফুলের নামকরণ হয়েছে ‘কৃষ্ণচূড়া’। সর্বোচ্চ ১২ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এই গাছ তার শাখা-প্রশাখা নিয়ে চারদিকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, গ্রীষ্মের প্রখর রোদে তা ক্লান্ত পথচারীকে সুশীতল ছায়া দেয়। আমাদের দেশে সাধারণত লাল, কমলা ও হলুদ—এই তিন রঙের কৃষ্ণচূড়া দেখা যায়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও বিজ্ঞান অনুষদ চত্বর, দ্বিতীয় ফটক, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে, বাংলাদেশ ব্যাংক ফটক এবং ভাষা শহীদ রফিক ভবনের পাশে এখন থোকায় থোকায় কৃষ্ণচূড়ার মেলা। প্রতিটি কোণ যেন লাল রঙের মায়াবী চাদরে ঢাকা পড়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, তপ্ত রোদেও শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। মাটিতে বিছিয়ে আছে ঝরে পড়া পাপড়ির লাল গালিচা। সেই রক্তিম গালিচাকে ঘিরে চলছে আড্ডা, গান আর ছবি তোলার হিড়িক। কেউবা স্মৃতি হিসেবে প্রিয়জনের জন্য কুড়িয়ে নিচ্ছেন একগুচ্ছ পাপড়ি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মকর্তা—সবার নজর কেড়েছে এই রঙিন ফুল।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রাফিয়া রায়হানা রিশা বলেন, "গ্রীষ্মের সীমাহীন উষ্ণতায় যখন ক্যাম্পাসে ঘুরি, তখন সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় ফুলের গালিচা দেখে মনে হয় প্রকৃতি আমাদের বরণ করে নিতে সাজিয়ে রেখেছে তার ডালি। ক্লান্ত হয়ে গাছের নিচে দাঁড়ালেই স্নিগ্ধ বাতাসে পাওয়া যায় সেই আবেগমাখা পুষ্পবর্ষণ।"
অন্যদিকে ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. কামরুল হাসান বলেন, "কৃষ্ণচূড়ার সমারোহ ক্যাম্পাসে এক যাদুকরী আকর্ষণ তৈরি করে। বৃষ্টির দিনে এই সৌন্দর্য যেন দ্বিগুণ হয়ে ধরা দেয়।"
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিন অরিধা নীলা মনে করেন, বৈশাখ পেরিয়ে জ্যৈষ্ঠের যে ইঙ্গিত প্রকৃতি দেয়, কৃষ্ণচূড়া তার অন্যতম প্রতীক।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসের অধিকাংশ কৃষ্ণচূড়া গাছ রোপণ করা হয়েছিল জগন্নাথ কলেজ থাকাকালীন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের পর একাডেমিক ভবন ও দ্বিতীয় ফটক সংলগ্ন গাছগুলো লাগানো হয়। তবে ক্যাম্পাসের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর স্মৃতি হয়ে আছে ‘লাল সুন্দরী’। শান্ত চত্বরের সেই শতবর্ষী গাছটি ২০১৭ সালে ভেঙে পড়লেও নতুন প্রজন্মের গাছগুলো এখন ক্যাম্পাসকে রঙিন করে রাখছে।
ব্যস্ত শহরের মাঝে জবি ক্যাম্পাসের এই কৃষ্ণচূড়া কেবল সৌন্দর্যই ছড়াচ্ছে না, বরং শিক্ষার্থীদের মনে এক চিলতে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। গ্রীষ্মের এই দহন দিনে তাই কৃষ্ণচূড়ার ছায়াতলই এখন জবিয়ানদের প্রধান আশ্রয়স্থল।







