মতামত

বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও জবাবদিহির চ্যালেঞ্জ

এ বি এম মহিউদ্দিন

শেয়ারঃ

বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও জবাবদিহির চ্যালেঞ্জ- খবরের থাম্বনেইল ফটো

বাংলাদেশের নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষিত হয়েছে। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।


কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাজেটের আকার বড় হলেই কি জনগণের জীবনমান উন্নত হবে? বাস্তবতা বলছে, দেশের সাধারণ মানুষ এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়, বরং এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।


নতুন বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি প্রায়ই উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। করের আওতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। শুধুমাত্র করের বোঝা বাড়িয়ে নয়, বরং কর ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়েই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে।


এ বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। সড়ক, পরিবহন, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে বড় বড় পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো সময়ক্ষেপণ এবং ব্যয় বৃদ্ধি। প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে না।


অন্যদিকে, বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হওয়া উচিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি নির্ভর করে দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক জনশক্তির ওপর। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।


বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।


সবশেষে বলা যায়, বাজেট কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের রূপরেখা। জনগণ এখন বড় অঙ্কের বাজেট নয়, বরং তার দৃশ্যমান সুফল দেখতে চায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নই হতে পারে বাজেটের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। সরকার যদি এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে এই বাজেট দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।


সম্পর্কিত খবর