ক্যাম্পাস
গৌরবের ১০৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দরিদ্র, অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চশিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান আজ ১০৬ বছরে পদার্পণ করেছে। বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশ, শিক্ষিত জাতি গঠন এবং ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান; দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব ও প্রেরণার উত্স হিসেবে ভূমিকা রেখে বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ দেশের প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
১৯২১ সালের ১ জুলাই ঔপনিবেশিক শাসনামলে পূর্ববঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের উচ্চশিক্ষার দাবির প্রেক্ষাপটে ঢাকার রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি। বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এর প্রতিষ্ঠা। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড লিটন এটিকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘স্প্লেনডিড ইম্পিরিয়াল কমপেনসেশন’ অর্থাত্ ‘বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে সাম্রাজ্যের এক অনন্য উপহার’। সেসময় মাত্র তিনটি আবাসিক হল ও তিনটি অনুষদের অধীনে (বিজ্ঞান, কলা ও আইন) ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৪৭ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির। বর্তমানে অনুষদের সংখ্যা ১৩, মোট বিভাগের সংখ্যা ৮৪। এছাড়া রয়েছে ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৫৭টি গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র, ১৯টি আবাসিক হল এবং ৪টি হোস্টেল। বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৭ হাজারেরও বেশি। পাশাপাশি রয়েছে ২ হাজারের বেশি শিক্ষক, ১ হাজারের বেশি কর্মকর্তা এবং প্রায় ৩ হাজার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০৫ বছর অতিক্রম করলেও অপ্রতুল বাজেট, সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলছে। আবাসন সংকটে ভুগছেন শিক্ষার্থীরা, পুরোনো শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারে চলছে পাঠদান ও গবেষণা। শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক সেবাও এখনো আধুনিকায়ন হয়নি। একই সঙ্গে আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্থবিরতা এবং শিক্ষকদের একটি অংশের একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে বেশি মনোযোগী থাকার অভিযোগও রয়েছে। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৩৩ কোটি ২১ লাখ টাকা বাজেট ঘোষণা করেছে। বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ এখনো সীমিত। গবেষণা অনুদানের জন্য মাত্র ২১ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের মাত্র ২ দশমিক ০৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও সম্প্রতি প্রকাশিত ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৭: টপ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিস’ শীর্ষক তালিকায় তৃতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান (ডিইউএপি) ২০২৬-২০৪৬’। উপাচার্য ড.এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে এটির ঘোষণা দেন। পাঁচ ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য এই পরিকল্পনার লক্ষ্য শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনে সংস্কার এনে ২০৪৬ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুকরণীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসটি উপলক্ষ্যে এক শুভেচ্ছা বার্তায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার আধুনিকায়ন এবং অগ্রযাত্রায় সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
দিনব্যাপী নানা আয়োজন: বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষ্যে এ বছর ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ সকাল সাড়ে নয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ শোভাযাত্রা সহকারে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সমবেত হবেন। সেখান থেকে উপাচার্যের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। সকাল দশটায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখস্থ পায়রা চত্বরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলসমূহের পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটা হবে। এ সময় সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং এবং রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত পরিবেশিত হবে। এছাড়া সকাল সাড়ে দশটায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গতকাল দেওয়া এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো.সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এবং বাহক, আগামী দিনেও জাতিকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যোগ্য নেতৃত্ব ও মানবিকতার পথে দিকনির্দেশনা দেবে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন।’
পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই। ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কর্মপন্থা নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।







