জাতীয়

স্পেনের আলহাম্বরা প্রাসাদ: ৮০০ বছরের মুসলিম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

ডেস্ক

শেয়ারঃ

স্পেনের আলহাম্বরা প্রাসাদ: ৮০০ বছরের মুসলিম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী- খবরের থাম্বনেইল ফটো

ছবি : সংগৃহীত

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের গ্রানাডা শহরের পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্য বিস্ময় ‘আলহাম্বরা’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ইউরোপে মুসলিম সভ্যতার গৌরব, জ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতির এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। লালচে রঙের দেয়াল, মনোমুগ্ধকর নকশা, আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং সুচিন্তিত স্থাপত্যশৈলী আজও বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় আল-আন্দালুসের সেই স্বর্ণযুগের কথা।


‘আলহাম্বরা’ নামের অর্থ কী?

‘আলহাম্বরা’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘আল-হামরা’ (الحمراء) থেকে, যার অর্থ ‘লাল’ বা ‘লাল দুর্গ’। প্রাসাদের দেয়ালে ব্যবহৃত লালচে মাটি ও ইটের কারণে এ নামকরণ হয়েছে বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা। বর্তমানে এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত এবং স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর একটি।


কে নির্মাণ করেছিলেন আলহাম্বরা?

আলহাম্বরার নির্মাণকাজ শুরু হয় ১২৩৮ সালে, নাসরিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম আমির মুহাম্মদ প্রথম ইবনুল আহমারের হাতে। তিনি গ্রানাডার সাবিকা পাহাড়ে তাঁর রাজদরবার স্থানান্তর করে পুরোনো দুর্গ পুনর্গঠন এবং নতুন এক প্রাসাদ-নগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।


তবে আলহাম্বরা এক শাসকের কীর্তি নয়। পরবর্তী প্রায় আড়াই শতাব্দী ধরে নাসরিদ শাসকেরা এতে নতুন নতুন প্রাসাদ, অঙ্গন ও অলংকরণ সংযোজন করেন। বিশেষ করে সুলতান ইউসুফ প্রথম ও মুহাম্মদ পঞ্চমের শাসনামলে এর স্থাপত্যশৈলী সর্বোচ্চ উৎকর্ষে পৌঁছায়।


আলহাম্বরার দেয়ালে বারবার ফুটে ওঠা ‘লা গালিবা ইল্লাল্লাহ’

আলহাম্বরার সবচেয়ে স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর দেয়ালজুড়ে খোদাই করা আরবি ক্যালিগ্রাফি। প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে বহুবার যে বাক্যটি খোদাই করা হয়েছে, তা হলো- لا غالب إلا الله (লা গালিবা ইল্লাল্লাহ), যার অর্থ ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো বিজয়ী নেই।’


ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল নাসরিদ রাজবংশের রাজকীয় মূলমন্ত্র। খিলান, কলাম ও অলংকরণে বারবার এ বাক্যের উপস্থিতি মুসলিম শাসকদের আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি বিশ্বাস ও বিনয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।


একটি সম্পূর্ণ প্রাসাদ-নগরী: মসজিদ, স্নানাগার ও রাজপ্রাসাদ

আলহাম্বরা এমন একটি সম্পূর্ণ প্রাসাদ-নগরী, যেখানে মসজিদ, প্রার্থনাকক্ষ, স্নানাগার এবং কারুশিল্প কর্মশালাও ছিল। সুলতান মুহাম্মদ তৃতীয়ের শাসনামলে নির্মিত হয় আলহাম্বরার গ্রেট মসজিদ, যা তৎকালীন মুসলিম ধর্মীয় জীবনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। অর্থাৎ আলহাম্বরা শুধু রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক নয়, বরং একটি জীবন্ত মুসলিম সমাজেরও প্রতিচ্ছবি ছিল।


প্রকৌশল ও সৌন্দর্যের অনন্য মেলবন্ধন

আলহাম্বরা ইসলামি স্থাপত্যকলার এক অসাধারণ নিদর্শন। এর প্রতিটি অংশে নান্দনিকতা ও প্রকৌশল দক্ষতার অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।


শৈল্পিক অলংকরণ: জ্যামিতিক আরাবেস্ক নকশা, আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং ধর্মীয় ও সাহিত্যিক শিলালিপির মনোমুগ্ধকর উপস্থাপন।


উন্নত জল-প্রকৌশল: পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও নাসরিদ শাসনামলে দার্‌রো নদী থেকে পানি এনে খাল ও জলপ্রণালীর এক জটিল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে আলহাম্বরা এবং পার্শ্ববর্তী জেনেরালিফ প্রাসাদে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এর ঝরনা, জলাধার ও নহরগুলো আজও স্থাপত্যবিদ ও প্রকৌশলীদের আগ্রহের বিষয়।


স্থাপত্যিক বিস্ময়: ১২টি মার্বেল পাথরের সিংহের মুখ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার ‘কোর্ট অব দ্য লায়ন্স’ প্রাঙ্গণটি আলহাম্বরার অন্যতম আকর্ষণ এবং ইসলামি স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন।


আল-আন্দালুসের শেষ অধ্যায় ও ‘মুরের শেষ দীর্ঘশ্বাস’

১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি গ্রানাডা পতনের মাধ্যমে স্পেনে প্রায় আট শতাব্দীর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। নাসরিদ রাজবংশের শেষ শাসক আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মদ দ্বাদশ (বোআব্দিল) আলহাম্বরার চাবি স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফের্দিনান্দ ও রানি প্রথম ইসাবেলার হাতে তুলে দেন।


মুসলিম শাসনের অবসানের পর আলহাম্বরার কিছু ধর্মীয় স্থাপনা ও স্থাপত্যিক অংশ খ্রিস্টীয় ব্যবহারের উপযোগী করে পরিবর্তন করা হয়, যা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে।


ইতিহাসে প্রচলিত একটি করুণ বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রানাডা ত্যাগের সময় পাহাড়ের এক চূড়ায় দাঁড়িয়ে বোআব্দিল শেষবারের মতো আলহাম্বরার দিকে তাকিয়ে অশ্রুপাত করেছিলেন। তখন তাঁর মা তাঁকে বলেছিলেন, ‘যে রাজ্য তুমি পুরুষের মতো রক্ষা করতে পারোনি, তার জন্য নারীর মতো কেঁদো না।’ যদিও অনেক ইতিহাসবিদ এ উক্তির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক করেছেন, তবুও এটি আল-আন্দালুসের পতনের ইতিহাসে এক আবেগঘন কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত।


অবহেলা থেকে পুনরুত্থান

মুসলিম শাসনের অবসানের পর আলহাম্বরা দীর্ঘদিন অবহেলার শিকার হয়। ১৯শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নেপোলিয়নের ফরাসি বাহিনী পিছু হটার সময় প্রাসাদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ১৮২১ সালের ভূমিকম্পেও এটি ক্ষতির মুখে পড়ে।


পরে মার্কিন লেখক ওয়াশিংটন আরভিং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Tales of the Alhambra-এর মাধ্যমে এই স্থাপনাকে বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচিত করে তোলেন, যা এর সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক আগ্রহ সৃষ্টি করে। এরপর ধারাবাহিক পুনরুদ্ধার কাজের মাধ্যমে আলহাম্বরা আজকের রূপে টিকে আছে।


আজও কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মুসলিম শাসনের অবসান হলেও আলহাম্বরা ধ্বংস হয়ে যায়নি। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে এটি বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।


প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আলহাম্বরা দেখতে স্পেনে যান। সেখানে তারা ইউরোপের বুকে ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার এক গৌরবময় অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।


মুসলমানদের জন্য শিক্ষা

আলহাম্বরা মুসলিম উম্মাহর জন্য ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি মনে করিয়ে দেয়, ঈমান, জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও উৎকর্ষচর্চা একটি জাতিকে সভ্যতার শীর্ষে পৌঁছে দিতে পারে। আবার অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং আদর্শ থেকে বিচ্যুতি একটি সমৃদ্ধ সভ্যতার পতনের কারণও হতে পারে।


তাই আলহাম্বরার ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়; এটি আত্মসমালোচনা, শিক্ষা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রেরণা সঞ্চয়েরও এক মূল্যবান অধ্যায়।


সম্পর্কিত খবর