ক্যাম্পাস

সংকট সমাধানের মূলা ঝুলিয়ে, অনন্ত কালের প্রকল্প জবি প্রশাসনের

জবি প্রতিনিধি

শেয়ারঃ

সংকট সমাধানের মূলা ঝুলিয়ে, অনন্ত কালের প্রকল্প জবি প্রশাসনের- খবরের থাম্বনেইল ফটো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক আবাসন সংকট সমাধানে প্রায় এক বছর আগে ২০ কোটি টাকার একটি অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, দ্রুত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা। তবে এক বছর পার হলেও সেই প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে একই অর্থে ১০ তলা স্থায়ী ছাত্রাবাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।


এ জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জরুরি আবাসন সংকট সমাধানের জন্য বরাদ্দ হওয়া অর্থ এখন দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে বর্তমান শিক্ষার্থীদের হলে ওঠার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে।


বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, অস্থায়ী টিনশেড স্থাপনায় অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে স্থায়ী ভবন নির্মাণ করলে দীর্ঘমেয়াদে বেশি শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পাবেন।


বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আবাসন সংকট নিরসনের জন্য অতিরিক্ত ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। যা কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমিতে অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে।


আবাসন সংকট নিরসনের দাবিতে গত বছরের মে মাসে আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ১৪ মে থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে আবাসন সংকটের পাশাপাশি ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন বৃত্তি চালু, পূর্ণাঙ্গ বাজেট অনুমোদন এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও ছিল।


আন্দোলনের এক পর্যায়ে গত বছরের ১৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়ে অনশনরত শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙান। পরে সিদ্ধান্ত হয়, কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাত একর জমিতে দ্রুত অস্থায়ী আবাসন তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা করার লক্ষ্য ছিল।


তবে প্রায় এক বছর পরও সেই অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। এর পরিবর্তে গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ই-টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে ১০ তলাবিশিষ্ট ছাত্রহল নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়।


বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রকল্পের সময়সীমা বেড়ে যেতে পারে। কারণ একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণে নকশা অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নিয়োগ এবং নির্মাণকাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।


এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে স্থায়ী আবাসন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনাও চলমান রয়েছে। ফলে বর্তমান জরুরি আবাসন সংকট মোকাবিলায় ২০ কোটি টাকার প্রকল্পের অগ্রাধিকার, সময় এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, যে প্রকল্প শুরু করতেই এক বছরের বেশি সময় লেগেছে, সেই প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমান শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কতটা দ্রুত সমাধান হবে, তা অনিশ্চিত।


২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. তানভীর হোসেন বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল তিন মাসের মধ্যে থাকার ব্যবস্থা হবে। এখন সেটি কয়েক বছরের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমান শিক্ষার্থীরা এর সুবিধা পাবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।”


তিনি বলেন, “আমাদের চতুর্থ বর্ষ চলছে। এই সময়ে অস্থায়ী হল হলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু স্থায়ী ভবনের জন্য অপেক্ষা করতে হলে অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে চলে যাবেন।”


আরেক শিক্ষার্থী মারুফ বলেন, "স্থায়ী হল দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে হবে, কেরানীগঞ্জের ৭ একরে কেন?"


ছাত্র প্রতিনিধিদের অভিযোগ, অস্থায়ী আবাসনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনা করেই প্রথমে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।


শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ বলেন, “আবাসন সংকট দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যেই অস্থায়ী হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেটিকে স্থায়ী ভবন প্রকল্পে রূপ দিয়েছে।”


শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সভাপতি একেএম রাকিব বলেন, "আমি তেমন কিছু জানি না। ঠিকাদারের ঢিলেমিতে কাজ ধীরগতির হয়। তবে শিক্ষার্থীরা প্রেশার দিলে, প্রশাসন যথাসময়ে কাজ হাতে পাবে।"


তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অস্থায়ী টিনশেড ভবন নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে সেটি অপসারণ করতে হবে। একই জায়গায় স্থায়ী ভবন নির্মাণ করলে দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, “টিনশেড ভবনে জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের বিষয় বিবেচনা করে স্থায়ী ১০ তলা ছাত্রহল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”


তিনি বলেন, “একই জায়গায় অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা যাবে। তাই অস্থায়ী স্থাপনার পরিবর্তে স্থায়ী ভবনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।”


উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, “বরাদ্দ পাওয়া হয়েছিল অস্থায়ী আবাসনের জন্য। তবে ওয়ার্কস কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিনশেড ভবনের পরিবর্তে স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”


তিনি বলেন, “টিনশেড ভবন ভবিষ্যতে ভেঙে ফেলতে হতো। স্থায়ী ভবন হলে সেটি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যাবে। আপাতত এটি শিক্ষার্থীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হবে। পরে প্রয়োজন হলে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের কাজেও ব্যবহার করা যাবে।”


সম্পর্কিত খবর