ক্যাম্পাস
জাকসুর মেয়াদ বাকি ১১ দিন, নতুন নির্বাচনের রোডম্যাপ দাবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) মেয়াদ শেষ হতে আর ১১ দিন বাকি। এর আগেই ১১তম জাকসু নির্বাচনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা এবং নির্বাচন আয়োজনের অর্থায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের অবস্থান জানাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন জাকসু নেতারা।
রবিবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে জাকসুর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা। এ সময় জাকসুর এক বছরের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন দাবির বাস্তবায়ন অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘ সময় পর জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষ ভোটে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখতে এ নির্বাচনী ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, “এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—নির্ধারিত সময়ে জাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচনি ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, মেয়াদ শেষে নেতৃত্বশূন্যতা এড়াতে আগেভাগে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও তফসিল ঘোষণা, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে জাকসুর নিয়মিত সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা।
তিনি জানান, এ বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। উপাচার্য জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং এ অর্থের জন্য রাষ্ট্র থেকে সরাসরি কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও বৃহৎ পরিসরের নির্বাচনের কারণে সরকারের সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
মাজহারুল ইসলাম বলেন, “অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও দ্রুত একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
মাজহারুল ইসলাম বলেন, “অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও দ্রুত একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
“আমরা সরকারের কাছে নির্বাচন হবে কি হবে না—সেই সিদ্ধান্ত চাইছি না। অর্থায়ন ও নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্রুত জানানো হোক”, যোগ করেন তিনি।
জাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এ বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী নির্বাচনের রোডম্যাপ দেখতে চান বলে জানান মাজহারুল।
সংবাদ সম্মেলনে জাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, “২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দশম জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। ছোট-বড় বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কিছু দাবি প্রশাসনের আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছেন তারা।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রত্যাশিত অটোমেশন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “অটোমেশন বাস্তবায়নে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপত্র মূল্যায়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। উপাচার্য বর্তমান জাকসুর মেয়াদের মধ্যেই এ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের আশ্বাস দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ৫৫তম ব্যাচ থেকে পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষার্থীকে অটোমেশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।”
একাডেমিক সংস্কারের বিষয়ে ভিপি বলেন, “শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের কয়েকটি দাবি একাডেমিক কাউন্সিলে নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে এবং আগামী সিন্ডিকেটে কয়েকটি বিষয় চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে। এর মধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, গবেষণা সহকারী নিয়োগ এবং শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর বিষয় রয়েছে।”
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের থিসিস গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ কমিটির সভায় বিদ্যমান ৭৫০ টাকার পরিবর্তে ৮ হাজার টাকা করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগামী সিন্ডিকেটে বিষয়টি নিয়ে আরো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ক্যাম্পাসের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে জিতু বলেন, “অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ক্যাম্পাসের ৮ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার রাস্তা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সড়কের সঙ্গে ফুটপাত ও সাইকেল চলাচলের ব্যবস্থাও যুক্ত থাকবে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর এ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে।”
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের বিশমাইল এলাকায় রাঙ্গামাটি নামক স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে বর্জ্য আমিনবাজারের ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, পরবর্তী জাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদ্যমান গঠনতন্ত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান ভিপি। তিনি বলেন, “দীর্ঘ ৩৩ বছরের পুরোনো গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের মতামতের জন্য জাকসুর ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর কার্যনির্বাহী সভায় চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
জাকসুর আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশে তিন সদস্যের একটি নিরীক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। উপাচার্যের মনোনীত একজন শিক্ষক, কোষাধ্যক্ষের মনোনীত একজন প্রতিনিধি এবং জাকসুর একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত এ কমিটি বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রস্তুত করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের অনিয়ম নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও প্রশাসনের আশ্বাস পাওয়ার কথা জানান জিতু। তিনি বলেন, “উপাচার্য আগামী সিন্ডিকেটে তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।”
এছাড়া, শারীরিক শিক্ষা বিভাগের বাজেট ১৮ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০২৬ অর্থবছরে ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে ভিপি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত মাস্টার প্ল্যান ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ‘গ্রিন বুক’-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে এটি বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে জাকসু নেতারা বলেন, “বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হলেও শুরু করা বিভিন্ন সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিয়মিত জাকসু নির্বাচন অপরিহার্য।” তাই অর্থায়ন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করে ১১তম জাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানান তারা।








