আন্তর্জাতিক
গাজার ধ্বংসস্তূপে ফুটবলের প্রত্যাবর্তন: অবরুদ্ধ জনপদে আশার আলো

গাজা আজ এক ধ্বংসস্তূপের নাম। যেদিকে চোখ যায়, কেবল বিধ্বস্ত ভবন, ভাঙাচোরা দেয়াল আর ধুলোমাখা স্মৃতি। দীর্ঘদিন ধরে দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর লাগাতার বোমাবর্ষণে গাজার অসংখ্য বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। মানবিক বিপর্যয়ের এই করুণ অধ্যায়ে অসংখ্য নিরীহ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। অবরুদ্ধ এই জনপদে দুই বছরেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণ—ফুটবল।
তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও জীবন থেমে থাকে না। প্রতিকূলতার বুক চিরে আবারও ঘুরতে শুরু করেছে ফুটবল। সম্প্রতি গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় একটি ফাইভ-এ-সাইড পিচে আয়োজন করা হয় একটি ক্ষুদ্র ফুটবল টুর্নামেন্ট। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
ইট-পাথরের স্তূপে ঘেরা জরাজীর্ণ মাঠে মুখোমুখি হয় জাবালিয়া ইয়ুথ ও আল-সাদাকা। কঠিন বাস্তবতার মাঝেও খেলোয়াড়দের লড়াই ছিল প্রাণবন্ত। ম্যাচটি অমীমাংসিতভাবে শেষ হলেও তাতে হতাশ হয়নি কেউ। একইভাবে বেইত হানুন ও আল-শুজাইয়ার মধ্যকার দ্বিতীয় ম্যাচটিও ড্র হয়।
মাঠের চারপাশে ভাঙা অবকাঠামোর মাঝেই জড়ো হয় স্থানীয় দর্শকরা। তাল আল-হাওয়া এলাকার ‘প্যালেস্টাইন পিচ’-এর পাশের চেইন-লিংক বেড়া ধরে তারা উল্লাসে ফেটে পড়েন, খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন। তাদের কণ্ঠে ছিল বেঁচে থাকার অদম্য প্রত্যয়।
জাবালিয়া ইয়ুথের ফুটবলার ইউসুফ জেন্দিয়ার বাড়িও ছিল গাজায়, যা ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে এখন প্রায় জনশূন্য। বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসরাইলের হামলা থেকে বেঁচে ফুটবল মাঠে ফেরার অনুভূতি নিয়ে মিশ্র অনুভূতি জানিয়েছেন ইউসুফ, ‘দ্বিধান্বিত, খুশি, দুঃখিত, আনন্দিত, আবার খুশি। মানুষ সকালে পানি, খাবার ও রুটির খোঁজে বের হয়। জীবন কিছুটা কঠিন। কিন্তু দিনের কিছুটা সময় থাকে, যখন আপনি এসে ফুটবল খেলতে পারেন এবং ভেতরের কিছু আনন্দ প্রকাশ করতে পারেন।’
সামনে থেকে নিজের অনেক সাবেক সতীর্থকে প্রাণ হারাতে দেখেছেন। তাদের অনেকে হয়েছেন আহত। আঘাতের ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি কেউ। সতীর্থ হারানোর কষ্ট এখনো ছুঁয়ে যায় ইউসুফের হৃদয়কে, ‘স্টেডিয়ামে এলে অনেক সতীর্থকে না পেয়ে কষ্ট হয়- কেউ নিহত, কেউ আহত, কেউ চিকিৎসার জন্য বাইরে গেছেন। তাই আনন্দটা পূর্ণ নয়।’
অবরোধ, ধ্বংস আর শোকের ভারে নুয়ে পড়া গাজায় এই ফুটবল টুর্নামেন্ট যেন এক প্রতীকী বার্তা—দখলদারিত্ব ও আগ্রাসনের মুখেও ফিলিস্তিনিদের মনোবল ভেঙে যায়নি। খেলাধুলা এখানে কেবল বিনোদন নয়; এটি প্রতিরোধের ভাষা, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাধীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।








