জাতীয়

ব্যাংক মালিকানা ফেরানোর পথ খুলল এস আলম ও নাসা গ্রুপের জন্য

প্রাইম বাংলাদেশ ডেস্ক

শেয়ারঃ

ব্যাংক মালিকানা ফেরানোর পথ খুলল এস আলম ও নাসা গ্রুপের জন্য- খবরের থাম্বনেইল ফটো

জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ায় একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানায় আগের শেয়ারহোল্ডারদের ফেরার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এর ফলে এস আলম ও নাসা গ্রুপসহ পূর্বতন মালিকপক্ষের জন্য আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না।


এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ ব্যাংক বিপর্যয়ের জন্য দায়ীদের অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। নতুন আইনে সেই বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এস আলম ও নাসা গ্রুপের মালিকানায় ফেরার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে এই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের বড় অংশ ছিল এই দুই গ্রুপের হাতে।


২০২৫ সালে অন্তবর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে এই আইন পাস করা হয়। নতুন আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো তফসিলি ব্যাংক রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় গেলে তার পূর্ববর্তী শেয়ারধারক কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদনকারীদের একটি বিস্তারিত অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে—তারা সরকারের বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব আর্থিক সহায়তা ফেরত দেবে, নতুন মূলধন জোগান দিয়ে বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করবে এবং সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় পরিশোধ করবে। এছাড়া কর, রাজস্ব ও ক্ষতিপূরণসহ সব আর্থিক দায় পরিশোধের প্রতিশ্রুতি এবং ব্যাংকের সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের পরিকল্পনাও থাকতে হবে।


অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, আবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে সরকারের অনুমোদন নেবে। অনুমোদনের পর আগের মালিকদের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বুঝে নিতে হলে সরকারের বিনিয়োগ করা অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ আগে জমা দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, শর্তগুলো পরিপালনের পর মালিকানা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা কিছুটা যৌক্তিক হতো। তবে সামান্য অর্থ জমা দিয়ে শুধু অঙ্গীকারের ভিত্তিতে মালিকানা পাওয়ার সুযোগ রাখা আত্মঘাতী হতে পারে। এতে আমানতকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ঝুঁকিতে পড়বে এবং দায়ী ব্যক্তিরা সহজেই পার পেয়ে যেতে পারেন। এছাড়া একবার কিছু অর্থ দিয়ে মালিকানা পেয়ে গেলে তাকে বাদ দেওয়া সহজ হবে না।


বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এটি কার্যত ব্যাংক ধ্বংসের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার শামিল। যারা অতিরিক্ত ও অনিয়মিত ঋণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করেছে, তাদেরই আবার ফেরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে—এটি জবাবদিহির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বার্তা।


তিনি আরও বলেন, এই অর্থ মালিকদের নিজস্ব উৎস থেকে আসবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, যা সংস্কারের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেবে।


গত শুক্রবার সংসদে বিলটির বিরোধিতা করে এবং ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ (২০২৫)’ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তাঁর মতে, এই বিলের মাধ্যমে কোটি মানুষের আমানতের সুরক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, অতীতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ব্যাংকগুলোকে বাঁচানো হয়েছে, যা মূলত সাধারণ করদাতাদের অর্থ। তাঁর আশঙ্কা, এই অধ্যাদেশ বা বিলটি বাতিল হলে লুণ্ঠনকারীরা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যেতে পারে।


তিনি উল্লেখ করেন, আগে ব্যাংক ডুবলে শেয়ারহোল্ডাররা প্রথমে ক্ষতির মুখে পড়তেন এবং আমানতকারীরা সুরক্ষিত থাকতেন। কিন্তু নতুন কাঠামোয় সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে বেনামি মালিকানার মাধ্যমে যে অনিয়ম হয়েছে, তা মোকাবিলায় আগের কঠোর আইনি কাঠামো বজায় রাখা প্রয়োজন ছিল।


সাইফুল ইসলাম মিলন আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান আইনি ক্ষমতা এই বিলের মাধ্যমে সংকুচিত হতে পারে, যা ব্যাংক খাতে আস্থা আরও কমিয়ে দেবে।


বিরোধিতার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং গুড গভর্ন্যান্স—এই তিনটিই বিএনপির মূল নীতি। সরকার আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে।


তিনি জানান, ইতোমধ্যে সরকার ব্যাংক খাতে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণ পরিস্থিতিতে কোনো সরকারের পক্ষে এত বিপুল অর্থ বহন করা সম্ভব নয়।


তিনি আরও আশ্বস্ত করে বলেন, লুণ্ঠনকারীদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং বাজারভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সচল রেখে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখাই এই বিলের মূল উদ্দেশ্য।


গত বছরের মে মাসে ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই অধ্যাদেশ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের আলোকে শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে।


ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার আমানতকারীদের মধ্যে বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পুরো অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্কিম ঘোষণা করেছে।


ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ পাঁচটিসহ একাধিক ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। এর বেশির ভাগই পরিচালনা করে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপ। বিএফআইইউয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির তালিকায় এস আলম গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।


সম্পর্কিত খবর