ক্যাম্পাস

শিক্ষার্থীদের দাবি

নিজেই অসুস্থ জবি মেডিকেল ও কাউন্সেলিং সেন্টার

মোহন খোন্দকার, জবি

শেয়ারঃ

নিজেই অসুস্থ জবি মেডিকেল ও কাউন্সেলিং সেন্টার- খবরের থাম্বনেইল ফটো

পুরান ঢাকার বহু সংকটের বৃত্তায়নে দাঁড়িয়ে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর দিন কাটে মেসের ঘিঞ্জি পরিবেশ আর দূষণের চাদরে। যা তাদের দেয় হতাশা, অসুস্থতা আর প্রতিকূলতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা অধিকাংশ শিক্ষার্থী টিউশনকে পুঁজি করে দিন পার করলেও সর্বোচ্চ ধাক্কা খায়, যখন একটু জটিল কিংবা গুরুতর অসুস্থতার শিকার হন।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যাপক পরিচিত ‘জবি নাপা বিল্ডিং’, যার শুদ্ধ নাম জবি মেডিকেল সেন্টার। তবে এখানে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। একজন এমবিবিএস চিকিৎসক দিয়ে চলে পুরো তদারকি ব্যবস্থা। গুরুতর কোনো সমস্যা হলে নেই তাদের দেওয়ার মতো কোনো সাপোর্ট। সে যেন নিজেই অসুস্থ, সেবা দেবে কী করে! ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের এ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই।


জানা যায়, প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী, পৌনে ছয়শ শিক্ষক, ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য রয়েছে মাত্র একজন ডাক্তার ও একটি অ্যাম্বুলেন্স। নেই কোনো বেডের ব্যবস্থা। নেই পর্যাপ্ত ওষুধ। নেই কোনো প্যাথলজি ল্যাব, ইসিজি বা আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা। বাজেট বরাদ্দেও জরাজীর্ণ অবস্থা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মাত্র ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ, যা মোট বাজেটের মাত্র ০.০৮৪ শতাংশ। বার্ষিক মাথাপিছু বরাদ্দ মাত্র ১২৫ টাকা।


শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন, মেট্রোনিডাজল, স্যালাইন ইত্যাদি জাতীয় প্রাথমিক ওষুধ ছাড়া কিছুই মেলে না জবি মেডিকেলে। একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, যা সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না। গুরুতর অসুস্থ হলে বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাজী মারুফ বলেন, “শুধু জ্বরের জন্য নাপা, ঠান্ডার ওষুধ ও প্রেসার মাপা ছাড়া তেমন কোনো চিকিৎসা এখানে দেওয়া হয় না। যা একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টারের জন্য অপ্রতুল।”


বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের উপ-প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মিতা শবনম বলেন, “প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আমি একাই পুরো মেডিকেল সেন্টারে রোগীদের দেখাশোনা করছি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ জন শিক্ষার্থী এখানে সেবা নিতে আসেন, যা এককভাবে সামাল দেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।”


তিনি আরও বলেন, “আরেকজন চিকিৎসক রয়েছেন। তবে তিনি ট্রেনিংয়ে থাকায় নিয়মিত সেবা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না। ফলে কার্যত পুরো দায়িত্ব আমার একার ওপরই বর্তেছে। এত বিপুল সংখ্যক রোগী একাই সামলাতে গিয়ে আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম চাপের মধ্যে আছি।”


অন্যদিকে, সংকট রয়েছে জবি কাউন্সেলিং সেন্টারেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০২২ সালের ৩ জানুয়ারি রফিক ভবনের নিচতলায় যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সেন্টার। আত্মহত্যাপ্রবণতা, বিষণ্নতা ও পরীক্ষা-ভীতির মতো সমস্যায় সহায়তা দিতে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রে ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত বিনামূল্যে সেবা দেওয়া হয়। চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী এখান থেকে সেবা নিয়েছেন।


বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শুরুতে কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মাসিক মাত্র ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। এ কারণে বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নিয়োগের প্রস্তাব সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়েছে, তা এখনো রেজিস্ট্রার দপ্তরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ। বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা ফিল্ডওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাউন্সেলিং সেবায় যুক্ত আছেন। বর্তমানে এখানে ৩০ জন কাউন্সেলর কাজ করছেন এবং মনোবিজ্ঞান বিভাগের পাঁচজন শিক্ষক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিটি কাউন্সেলিং সেশনে একজন শিক্ষার্থীকে ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট সময় দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন গড়ে ১২ জন শিক্ষার্থী এ সেবা গ্রহণ করেন।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সপ্তমী কর্মকার বলেন, “কাউন্সেলিং সেবার জন্য নিবন্ধন করার প্রায় এক মাস পর তিনি সিরিয়াল পান। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তখন তার সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়। তিনি মনে করেন, সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত মানসিক সমর্থন থেকে বঞ্চিত হন। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি কাউন্সেলিং সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা ও কার্যক্রম আরও উন্নত করার দাবি জানান।”


কাউন্সেলিং সেন্টারের অফিস সহকারী রেশমা রহমান বলেন, “লোকবল সংকট ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের ক্লাস-পরীক্ষার কারণে অনেক সময় সেবা দিতে বিলম্ব হয়। গড়ে প্রতিদিন ৩০ জন শিক্ষার্থী সেবা নিতে আসেন। গত বছর ১২০৪ থেকে ১৫৪২ সিরিয়াল পর্যন্ত মোট ৩৭৮ জন শিক্ষার্থী সেবা নিয়েছেন। বর্তমানে ৩০ জন ইন্টার্ন শিক্ষার্থী কাজ করছেন। চাহিদা বাড়লেও জনবল ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় সেবা ব্যাহত হচ্ছে।”


কাউন্সেলিং পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ড. ফারজানা আহম্মেদ বলেন, “কাউন্সেলর না থাকার চেয়ে এখন আমরা যা করছি, তা খারাপ না। অনেক আগেই দুজনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলছিলাম। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলর পোস্ট রয়েছে। তাছাড়া আমরা মেজর ক্লায়েন্টদের ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন জায়গায় রেফার করে দিই।”


বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিন বলেন, “আমার পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে আমি একটি কমিটি করে দিয়েছি, আমাদের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন মেডিকেলে কীভাবে সুবিধা পেতে পারে। ইতিমধ্যে তিন থেকে চারটি মেডিকেলের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। কথা চূড়ান্ত হলে আমরা একটি এমওইউতে (MoU) যাব এবং আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন এই সুবিধাটা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া আরও কী ধরনের সুবিধা পেতে পারে, আমরা সেটা নিয়েও স্টাডি করছি।


সম্পর্কিত খবর