আরও
সবুজের ছায়ায় নীরব ভাবনার সহাবস্থান খুবির অন্তর্লীন গল্প

খুলনা শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে একটু এগোলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। কোলাহল কমে আসে, বাতাসে ভেসে আসে নদীর গন্ধ, আর চোখের সামনে ধীরে ধীরে খুলে যায় বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর। এই শান্ত পরিবেশের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় যা শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় বরং একটি চিন্তাশীল জীবনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র।
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এটি এক ব্যাতিক্রমি পথ বেছে নিয়েছে। দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনুষদ-ভিত্তিক কাঠামোর বদলে এখানে চালু করা হয়েছে ডিসিপ্লিন-ভিত্তিক শিক্ষা ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি যেন প্রকৃতির সঙ্গে একটি নীরব চুক্তিতে আবদ্ধ। রূপসা নদীর পাশঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাসে সকাল শুরু হয় পাখির ডাকে। ক্লাসে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীরা হেঁটে চলে দীর্ঘ রাস্তা যেখানে মাথার ওপর ছায়া দেয় সারি সারি গাছ। এই হাঁটার পথই অনেক সময় হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব, তর্ক বা ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে আলোচনার স্থান। শহরের কংক্রিট ঘেরা জীবনের বাইরে এসে শিক্ষার্থীরা এখানে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পায়, যা শিক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ পরিচয় হলো এর একাডেমিক পরিবেশ। এখানে পড়াশোনার চাপ আছে কিন্তু সেটি কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক নয়। ক্লাসে প্রশ্ন করা, আলোচনা করা এবং ভিন্নমত প্রকাশ করাকে উৎসাহিত করা হয়। এখানে শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখানো হয় । গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা, পরিবেশ বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান সহ প্রায় সব ডিসিপ্লিনেই এই সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা দেখা যায়।
গবেষণার ক্ষেত্রেও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য এসব বিষয় এখানে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই গবেষণাগুলো শুধু একাডেমিক জার্নালে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে তা নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় অর্জন, কারণ জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। হাজার হাজার বই, জার্নাল, থিসিস ও গবেষণাপত্র নিয়ে এই গ্রন্থাগার শুধু পড়ার জায়গা নয় বরং এটি চিন্তা করার জায়গা। পরীক্ষার সময় লাইব্রেরির নীরবতা যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। এক শিক্ষার্থী বলেন, লাইব্রেরিতে বসে পড়লে সময়ের হিসাব থাকে না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় অজান্তেই।
তবে এই অর্জনের গল্পের পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আবাসন সংকট খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। সব শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পায় না। অনেককে শহরে মেসে থাকতে হয়, যা অর্থনৈতিক ও সময় ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ক্যাম্পাস পরিবহন ব্যবস্থাও এখনো পুরোপুরি শিক্ষার্থী বান্ধব হয়ে ওঠেনি। এসব সমস্যা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে পড়াশোনার মনোযোগেও ব্যাঘাত ঘটায়।
এছাড়া গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব একটি বড় সীমাবদ্ধতা। অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ভালো গবেষণা ধারণা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত অর্থ ও সুযোগের অভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। তবুও সীমিত সম্পদের মধ্যেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
সহশিক্ষা কার্যক্রমেও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে নেই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, নাটক, স্বেচ্ছাসেবী কাজ এসবের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সামাজিক ও নেতৃত্বগুণ বিকাশের সুযোগ পায়। অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই সামাজিক আন্দোলন, পরিবেশ সচেতনতা বা মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয় যা তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
সবকিছু মিলিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় হঠাৎ করে চমক দেখায় না বা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায় না। বরং নীরবে ধারাবাহিকভাবে নিজের কাজ করে যায়। এখানে পড়াশোনা করা মানে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন নয়। এটি আমাদের সামনে এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজকে একসঙ্গে ভাবতে শেখানো হয়।
আজ যখন উচ্চশিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কেবল চাকরির সনদে পরিণত হচ্ছে তখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্ববিদ্যালয় আসলে একটি চিন্তার কারখানা। সবুজের ছায়ায়, নদীর ধারে, নীরবতার ভেতর দিয়েই এখানে গড়ে ওঠে সেই চিন্তা যা ধীরে হলেও সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।







