ক্যাম্পাস

মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় নিভছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সোনালি স্বপ্ন।

রাবি প্রতিনিধি

শেয়ারঃ

মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় নিভছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সোনালি স্বপ্ন। - খবরের থাম্বনেইল ফটো

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীদের ৭৩ শতাংশই ভুগছেন বিষন্নতায়। গবেষকরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন ডিজিটালাইজেশন, রাতজাগা অভ্যাস এবং সীমিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মিলিয়ে ক্যাম্পাস জুড়ে তৈরি হচ্ছে নীরব মানসিক সংকট।


গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে রাবির পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগের একদল গবেষক 'Association of Depres-sion with Internet Addiction among Students of a Public University in Bangladesh' শীর্ষক গবেষণা পরিচালনা করেন। চলতি বছরের মার্চে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত হয় গবেষণাপত্রটি। গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ১ হাজার ১৪ জন শিক্ষার্থীর ওপর চালানো হয় জরিপ।


এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভুগছেন ইন্টারনেট আসক্তিতে। আর বিষন্নতার লক্ষণ পাওয়া গেছে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীদের ৭৩ শতাংশই (৭২ দশমিক ৮) ভুগছেন বিষণ্ণতায়। আর আসক্ত নন এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই হার ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ।


গবেষণায় আরও দেখা যায়, ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রায় পাঁচগুণ বেশি।


গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া প্রধান গবেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম মণ্ডল বললেন, 'ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার বিদেশের অনেক গবেষণার তুলনায় বেশি। ভারতের চণ্ডীগড়ে যেখানে এই হার ছিল ২৭দশমিক ৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৩০ শতাংশ, সেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক। এখানে ইন্টারনেট আসক্তদের ৭৩ শতাংশই ভুগছেন বিষন্নতায়।'


শুধু গবেষণার তথ্য নয়; সরেজমিন অনুসন্ধানেও মিলেছে একই রকম চিত্র। গত কয়েক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ঘুরে দেখা যায়, গভীর রাত পর্যন্ত অনেক শিক্ষার্থী ব্যস্ত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কেউ অনলাইন গেমে, আবার কেউ সিরিজ কিংবা ভিডিও কনটেন্ট দেখতে দেখতে পার করছেন রাত। অনেক শিক্ষার্থীই স্বীকার করেছেন, এই অভ্যাস এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এভাবেই মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় নিভছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সোনালি স্বপ্ন।


বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পড়াশোনার প্রয়োজন ছাড়া প্রতিদিন ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত তারা অনলাইনে কাটান। অনেকেই রাতজেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতে গিয়ে ঘুম, পড়াশোনা এমনকি সামাজিক সম্পর্কও হারাচ্ছেন ধীরে ধীরে।


পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেছেন, 'শুরুতে এটা শুধু বিনোদন ছিল। এখন ফোন ছাড়া থাকতে পারি না। পরীক্ষার আগের রাতেও ফোন চেক করি কয়েক মিনিট পরপর। কখন রাত শেষ হয়ে যায় বুঝতেই পারি না।'


গবেষকরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতামূলক প্রচার, সহজলভ্য ও গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা কার্যক্রম বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে বৃহৎ পরিসরে গবেষণারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।



সম্পর্কিত খবর