সারাদেশ
মেঘনা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার তিনটি মৌজার নামে ইজারা নেওয়া বালুমহালের আড়ালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ অংশে মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে তারা ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করলে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজারো যাত্রী।
সোমবার (৩০ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আশুগঞ্জ গোলচত্বরে এ অবরোধের ঘটনা ঘটে। দুপুর দেড়টার দিকে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আশ্বাসে আন্দোলনকারীরা অবরোধ তুলে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
স্থানীয়রা জানান, সকাল ১০টার দিকে চরসোনারামপুর এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে কয়েক শ’ নারী-পুরুষ আশুগঞ্জ গোলচত্বরে গিয়ে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে তারা সড়কে শুয়ে বিক্ষোভ করলে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
অবরোধের কারণে মহাসড়কের পশ্চিম পাশে মেঘনা সেতু পেরিয়ে ভৈরব পর্যন্ত এবং পূর্ব পাশে বেড়তলা এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার সাদেকপুর, লুন্দিয়া ও টুকচানপুর মৌজার নামে বালুমহালের ইজারা দেওয়া হলেও বাস্তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরসোনারামপুর সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
তাদের দাবি, নির্বিচারে ড্রেজিংয়ের কারণে চরসোনারামপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা, আশুগঞ্জ বাজার, আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, জাতীয় গ্রিডের ৩৩ হাজার কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটি, কৃষিজমি ও নদীতীর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে নদীভাঙনের আশঙ্কাও বেড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, চরসোনারামপুরে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। তাঁদের বেশির ভাগই মৎস্যজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় থাকতে হয়। বর্তমানে গ্রামের শ্মশান, মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিতল চন্দ্র দাস বলেন, নদী তাদের জীবিকার উৎস। কিন্তু অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণে সেই নদীই এখন বসতভিটা কেড়ে নেওয়ার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ইজারা দেওয়া হয়নি, সেখানে দিন-রাত বালু উত্তোলন চলছে। তিনি অবিলম্বে এ কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানান।
আরেক বাসিন্দা বিপ্লব কুমার সূত্রধর বলেন, ‘ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে এবং গ্রামের সামনে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ মার্চ ভৈরব উপজেলার সাদেকপুর, লুন্দিয়া ও টুকচানপুর মৌজার মেঘনা নদীর বালুমহাল মেসার্স শফিক ট্রেডার্সের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারাভুক্ত এলাকায় পর্যাপ্ত বালু না থাকায় প্রতিদিন ভোর থেকে প্রায় ৩০টি ড্রেজার দিয়ে আশুগঞ্জ অংশে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অভিযোগও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আশুগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু হেনা মোস্তফা রেজা বলেন, ‘মহাসড়ক অবরোধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তাদের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পাঠানো হবে।’
আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, ‘স্থানীয়দের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সীমানা লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবু তাহের দেওয়ান বলেন, ‘অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।’
গত বছরও আশুগঞ্জের চরসোনারামপুর এলাকায় সীমানা লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে একাধিক ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হয়েছিল। ওই সময় কয়েকজনকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের আগের অভিযানের পরও একইভাবে আবার বালু উত্তোলন শুরু হওয়ায় এলাকায় নতুন করে নদীভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।







