ক্যাম্পাস
গৌরব-ঐতিহ্যে ৭৩ বছরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

গৌরব ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ৭৩ বছর শেষ করে ৭৪ বছরে পা রেখেছে প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৩ সালে রোপণ করা বীজটি বর্তমানে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে। আজ থেকে ৭৩ বছর আগে ৭টি বিভাগে ১৫৬ জন ছাত্র ও ৫ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে রাবি। বর্তমানে ১২টি অনুষদে ৫৯টি বিভাগ ও ৬টি ইনস্টিটিউটে রয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী।
উনিশশো বাহাত্তর সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনায় সূতিকাগার হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো এক জলন্ত বারুধ। দেশের মাটি ও মানুষের সব ধরনের ক্রান্তিলগ্নে সামনের সারিতে থেকে পথের দিশা, আলোর ঝলকানি দেখিয়েছে দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গবেষণায় নতুন দিগন্ত, শতভাগ আবাসিকতা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা এবং একটি আধুনিক, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস গড়ে তোলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী, শতাধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউট এবং ১৭টি আবাসিক হল রয়েছে। তবে ৭৩ বছরের পথচলায়ও আবাসন সংকট, সীমিত গবেষণা বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আবাসন সংকট। নতুন আবাসিক হল নির্মাণ, সুষ্ঠু সিট বণ্টন, উন্নত গবেষণা পরিবেশ, আধুনিক গ্রন্থাগার, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার রিয়া বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন ও পরিচয়ের অংশ। আমরা চাই গবেষণার আরও প্রসার, আধুনিক শিক্ষা-সুবিধা, আবাসন সমস্যার সমাধান এবং একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে বিকশিত হবে।”
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব ইসলাম বলেন, “শতভাগ আবাসিকতা, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান বৃদ্ধি ও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিট বাণিজ্য বন্ধ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।”
গবেষণায় আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন বলেন, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে গবেষণারড বাস্তব প্রয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ সংখ্যা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে সেশনজট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, গবেষণার মান উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি স্থাপন, আলোকায়ন বৃদ্ধি এবং গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
৭৩ বছরের গৌরবময় পথচলা শেষে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাই এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী,কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।







