ক্যাম্পাস
হলের গন্ডি পেরিয়ে রাজপথে ; জুলাই অভ্যুত্থানে রাবির নারী শিক্ষার্থীদের লড়াই

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে শুরু থেকেই পুরুষ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শত শত নারী শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। কেউ মিছিলের সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছেন, কেউ আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন, কেউ আবার হলের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। আবার ইন্টারনেট বন্ধ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও অনেকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
দুই বছর পর আন্দোলনের সেই দিনগুলো ফিরে দেখলে প্রশ্ন ওঠে—রাবির নারী শিক্ষার্থীদের সাহস, ত্যাগ ও নেতৃত্ব কি ইতিহাসে যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে, নাকি তাদের অনেক গল্পই এখনো আড়ালে রয়ে গেছে।
আন্দোলনের শুরুর দিকে অনেক নারী শিক্ষার্থী প্রথমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও সহিংসতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সংগঠিতভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, জুলাই -৩৬, হল (তৎকালীন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল), মন্নুজান হল, বেগম খালেদা জিয়া হলসহ মোট ৬টি ছাত্রী হল থেকে দলবেঁধে শিক্ষার্থীরা মিছিলে অংশ নেন। প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও নানা বাধা সত্ত্বেও তারা রাজপথে অবস্থান নেন।
আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং হল ছাড়ার নির্দেশের পর চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন নারী শিক্ষার্থীরা। অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ফিরতে পারেননি। ট্রেন-বাস চলাচলে বিঘ্ন, ইন্টারনেট বন্ধ এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় রাজশাহীতেই আটকে থাকতে হয়েছে অনেককে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
হল ছাড়ার পরও অনেক নারী শিক্ষার্থীর দুর্ভোগ শেষ হয়নি। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ফিরতে পারেননি, তারা রাজশাহীর বিভিন্ন মেসে আশ্রয় নেন। তবে পরে সেসব মেসে পুলিশ তল্লাশি চালানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানে অবস্থান করাও অনিরাপদ হয়ে ওঠে। একই সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগও ব্যাহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই স্থানীয় পরিচিতজন, বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের বাসায় আশ্রয় নেন। প্রায় এক সপ্তাহ পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে সক্ষম হন। পরে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করেও ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানান তারা।
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক পরিষদের অন্যতম নারী সদস্য ছিলেন তাসিন খান। তিনি বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর আমি সমন্বয়ক পরিষদে যুক্ত হই। তখন মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম—এই সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হবে না। মনে হয়েছিল, বেঁচে থাকলেও হয়তো জেলে যেতে হবে বা পলাতক জীবন কাটাতে হবে। ৫ আগস্টের পরের জীবনকে আমি বোনাস জীবন বলেই মনে করি। জুলাই আমাকে বিবেকের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে। আন্দোলনের পর আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি। বিভিন্ন সুযোগ এলেও কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হইনি। তবে রাজনীতিসচেতন নাগরিক হিসেবে থাকতে চাই এবং দলান্ধতাকে সবসময় প্রত্যাখ্যান করি।"
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক নারী শিক্ষার্থীর কাছে সেই দিনগুলো এখনো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। তাদের কেউ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে আরও সচেতন হয়েছেন, কেউ নেতৃত্বের মূল্য উপলব্ধি করেছেন, আবার কেউ এখনো সেই সময়ের মানসিক চাপ ও স্মৃতি বহন করছেন। তবে সবার বিশ্বাস, ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সাহস, ঐক্য ও দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই।
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক নারী শিক্ষার্থী ও রাকসুর মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সাইয়েদা হাফসা বলেন, "কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল একটি যৌক্তিক আন্দোলন। তাই শুরু থেকেই আমরা এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছি। ২০২৪ সালের আন্দোলনেও আমাদের অবস্থান একই ছিল। আমাদের সংগঠনের সদস্যরা ৭ জুলাই থেকেই অনলাইন ও অফলাইন—উভয় মাধ্যমেই সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। সব হল থেকেই নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হন।
তিনি বলেন, ১৪ জুলাই রাতে বেগম খালেদা জিয়া হলের ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে বেরিয়ে মিছিলে যোগ দেন। অন্যান্য হলের ছাত্রীরাও একইভাবে বেরিয়ে এসে আন্দোলনে শামিল হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সেদিন কেউ লাঠি, কেউ মরিচের গুঁড়া, আবার কেউ বেডের স্ট্যান্ড হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। হলে অবস্থানরত প্রায় সবাই দলে দলে আন্দোলনে অংশ নেন।
তিনি আরও বলেন, ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ এবং গ্যাসের প্রভাব মেয়েদের হল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একই সময়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে আসছে। এতে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেদিন রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির ঘোষণা দেওয়া হয়। পরদিন সকাল থেকেই অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছাড়তে শুরু করেন। তবে কিছু সাহসী ছাত্রী হল না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের নির্দেশে তাদেরও হল ছাড়তে হয়।"
সে সময়ের ভয়াবহতার বর্নানা দিয়ে মন্নুজান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও বর্তমান হল সংসদের ভিপি সুমাইয়া জাহান বলেন, “আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। প্রথমদিকে ছোট ছোট দলে কর্মসূচিতে যুক্ত হলেও আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ছাত্রী হল থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিল, মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মন্নুজান হলের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও সামনের সারির ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং ন্যায্য দাবির পক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবেই তারা রাজপথে নেমেছিলেন।
তিনি বলেন, রাজপথের অভিজ্ঞতা যেমন অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল, তেমনি ছিল ঝুঁকিপূর্ণও। টিয়ারশেল, হামলা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলেও নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের স্থান ত্যাগ করেননি। প্রশাসনের নির্দেশে হল ছাড়ার দিনটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। কেউ স্বেচ্ছায় হল ছাড়তে চাননি; বাধ্য হয়েই বের হতে হয়েছে। পরিবহন সংকট, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে অনেকেই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেননি। অনেক শিক্ষার্থী পথে হামলা ও টিয়ারশেলের মুখেও পড়েন। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা সাহস, সংহতি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে ন্যায্য দাবির পক্ষে দৃঢ়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।”
জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম তুহিনা বলেন, "নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বলব, জুলাইকে শুধু একটি স্মৃতি হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা হিসেবে ধারণ করুন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি। সেই লড়াইয়ের চেতনা ধরে রেখে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।"
বিশ্লেষকরা মনে করেন , বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস তখনই পূর্ণতা পায়, যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার অবদান সমান গুরুত্বে নথিবদ্ধ করা হয়। শুধু নেতৃত্বের গল্প নয়, সাধারণ নারী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রাবির জুলাই আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে মৌখিক ইতিহাস, সাক্ষাৎকার ও তথ্যভিত্তিক গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে অংশ নেওয়া রাবির আরবি বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, "জুলাই বিপ্লব ও অভ্যুত্থানে নারী বিশেষ করে ছাত্রীরা সম্মুখসারির সংগঠক ও যোদ্ধা হিসেবে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেন। তারা শুধুমাত্র সমর্থনে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজপথে মিছিলে নেতৃত্ব দেন, স্লোগানে প্রকম্পিত করেন, আহতদের চিকিৎসায় সেবা প্রদান করেন এবং খাদ্য ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সে আন্দোলনকে বেগবান করেন। গ্রেফতার সহযোদ্ধাকে ছিনিয়ে আনতে বা আহত যোদ্ধার সেবায় খালি হাতে এগিয়ে যান।
তিনি বলেন, তবে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের উপস্থিতি এখনও অপ্রতুল এবং পরবর্তীতে তাঁদের অবদানকে অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।"
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি সাহস, ত্যাগ, প্রতিরোধ ও মানবিকতারও ইতিহাস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা সেই ইতিহাসে শুধু সহযাত্রী ছিলেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই ছিলেন সামনের সারির অংশগ্রহণকারী। তাদের না-বলা গল্পগুলো যত বেশি নথিবদ্ধ হবে, ততই পূর্ণতা পাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস।







