আন্তর্জাতিক

কলকাতার বড় ফল বাজারে ইসরায়েলি খেজুর বয়কট

ডেস্ক

শেয়ারঃ

কলকাতার বড় ফল বাজারে ইসরায়েলি খেজুর বয়কট- খবরের থাম্বনেইল ফটো

গাজায় চলমান ফিলিস্তিদের ওপর ইসরায়েলের নারকীয় হামলা, লাগাতার অবরোধ এবং হাজার হাজার নিরপরাধ নারী ও শিশু হত্যার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ চলছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা সেই অমানবিক ও নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবার অভূতপূর্ব প্রতিবাদ জানাচ্ছে কলকাতার মেছুয়ার ফল বাজার।


কলকাতার হাওড়াব্রিজ সংলগ্ন বড় বাজার। যেখানে পাইকারি ফল বাজারের নাম মেছুয়া ফলপট্টি, এটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় ফল বাজার। সেখানকার অধিকাংশ ব্যবসায়ী মুসলিম সম্প্রদায়ের। তারাই পবিত্র রমজান মাসে অভিনব প্রতিবাদ জানাচ্ছে ইসরায়েলকে। তবে কোনো সংগঠনের নির্দেশে নয়, মেছুয়া ফলপট্টির সবার সম্মতিতে এবারের রমজানে বয়কট করা হয়েছে ইসরায়েল থেকে আসা খেজুর।


ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট বার্তা, যে রাষ্ট্র মানবতার শত্রু এবং নিরীহ মানুষের রক্তে হাত রাঙিয়েছে, তাদের উৎপাদিত কোনো পণ্য রমজানের পবিত্র বাজারে স্থান পাবে না। আর তাই এ বছর সামগ্রিকভাবে ইসরায়েলের খেজুর বয়কট করেছেন তারা।


বড় বাজারের সবচেয়ে বড় খেজুর আড়তদার ব্যবসায়ী আনাস বিন আলী বয়কট প্রসঙ্গে বলেছেন, বর্তমানে কলকাতাসহ পুরো পশ্চিমবঙ্গের বাজারে ইসরায়েলি খেজুর পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সব ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই বয়কট আন্দোলন সফল করা হয়েছে এবং প্রতিটি ব্যবসায়ীকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন তারা কোনোভাবেই ইসরায়েলি খেজুর বিক্রি না করে।


তিনি অভিযোগ করেন যে, কিছু অসাধু চক্র কৌশলে প্যাকিং বা মোড়ক বদলে ইসরায়েলি খেজুর বাজারে ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল, মোড়কে নাম দেয়া হচ্ছিল জর্ডান, কিং সেলোমান, রিচ কান্ট্রি ইত্যাদি। কিন্তু নজরদারি চালিয়ে সেই প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আগামী দিনেও যাতে কেউ এই নিষিদ্ধ সামগ্রী বিক্রি করতে না পারে, তার জন্য ফলপট্টির পক্ষ থেকে একটি চূড়ান্ত ও ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই মুহূর্তে মুম্বাই থেকে আসা শত শত খেজুরের কার্টুন কন্টেইনারসহ ফেরত পাঠানো হয়েছে।


তার অভিমত, যারা শিশুদের হত্যা করে তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই ব্যবসা হতে পারে না। ফলে আমরা আমাদের সাধ্যমতো প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং ইসরায়েলের পণ্য বয়কট করছি।


অপর এক পইকারী খেজুর ব্যবসায়ী শাহিদ আলম অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, যেভাবে স্বৈরাচারী কায়দায় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, তার প্রতিবাদ জানানো প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কর্তব্য। তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি যে, ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যারা দাপট দেখাচ্ছে, সেই ইসলামের শত্রুদের কোনো পণ্য আমরা বড় বাজারে বিক্রি করব না। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে রোজা পালনের সময় এই ধরনের পণ্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি মুসলিম সমাজের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন।


কলকাতার বড় বাজারের ব্যবসায়ীদের এই সাহসী পদক্ষেপ শহরের অন্যান্য প্রান্তেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এই বয়কট আন্দোলনকে আরও সুসংহত করার শপথ নিয়েছেন মুসলিম ব্যবসায়ীরা।


বাক্স বাক্স খেজুর ফেরত যাওয়ায় এবং ব্যবসায়ীদের এই সিদ্ধান্তে খুশি রোজাদাররা। তার বদলে ক্রেতারা কিনছেন ইরাক, ইরান, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া ও সৌদির খেজুর। খুচরা ব্যবসায়ী শেখ আজহার উদ্দিন জানান, খুব ভালো উদ্যোগ নিয়েছে বড় বাজার। রোজার মাসে বিনা বিক্ষোভে প্রতিবাদ জানাতে এক অন্যতম মাধ্যম বেছে নিয়েছে তারা। ইসরায়েলি পণ্য বয়কট শুধু বয়কটই নয়, একটা বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে এই পবিত্র রমজান মাসে। পাইকারী ব্যবসায়ীদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছি আমরা।


ক্রেতা জামাল উদ্দিন জানান, পবিত্র রমজান মাসে এই উদ্যোগ সমর্থন করার মতো বিষয়। আমরা ব্যবসায়ীদের পাশে আছি। রমজানে আমরা বিদেশি খেজুরের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু যা শুনছি যে, ভিন্ন নামেও ইসরায়েলি খেজুর বিক্রি হচ্ছে, ফলে এবারে ঠিক করেছি, এই রমজান মাসে ভারতীয় খেজুরের বাইরে কিছু কিনব না। পাশাপাশি তিনি জানান, এবারে পাইকারী বাজরে বিদেশি খেজুরের দাম অনেকটাই বেশি।


এবারে দাম বাড়ার কারণ হিসেব খেজুরের আড়তদাররা জানাচ্ছেন, এমনিতে রোজার মাসে চাহিদা বাড়ে। তার উপর পশ্চিমা দেশে অশান্তির জন্য খেজুর সেভাবে আসছে না। যেমন এখনও ইরানের বন্দরে বহু কন্টেইনার আটকে রয়েছে। অপরদিকে মুম্বাই বন্দরেও কিছু এলসি সমস্যার কারণে খেজুরের কন্টেইনার আটকে রয়েছে। তার উপর ইসরায়েলের খেজুর বন্ধ রয়েছে। তবে সবাই বিষয়টাকে সমর্থন দিয়েছে। তবে এসবের জন্য বেচাকেনা খারাপ হচ্ছে না। বিক্রি ভালোই হচ্ছে।


বর্তমানের পাইকারী বাজারে মান অনুযায়ী জাম্বো মেদজুলের দাম রয়েছে ১৪-১৫শ’ রুপি। সাধারণ মেদজুল মান অনুযায়ী ৯শ’-এক হাজার রুপি। সবচেয়ে কম দামে পাইকারী বাজার খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ রুপিতে। খেজুরের নাম জাহিদি। সেসব খেজুর ইরাক থেকে আসছে। অনেকেই সেগুলো ভারতীয় বলে চালিয়ে দিচ্ছে।


সব মিলিয়ে এবারে দাম কিছুটা বাড়লেও একদিকে যেমন বিনা বিক্ষোভে ইসরায়েলকে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, তেমনই সমর্থন পাচ্ছে সবার। যার কারণে ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের ধারা বর্তমানে অত্যন্ত সফলভাবে অব্যাহত রয়েছে কলকাতার বড় বাজারে।


সম্পর্কিত খবর