সারাদেশ
রাঙামাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে

রাঙামাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি জেলা ছাত্রদল ও তাঁতি দলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে, যেকোনো সময় পরিস্থিতি সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দলীয় কার্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এরপর থেকে জেলা বিএনপির কার্যালয় ও আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ আট বছর পর গত ২ মে কেন্দ্র থেকে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের ২৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটি ঘোষণার পর একাংশ আনন্দ প্রকাশ করলেও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত, মাদককারবারি ও বিভিন্ন মামলার আসামি রয়েছে।
বিক্ষুব্ধদের দাবি, কেন্দ্রীয় কিছু নেতার আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং এতে জেলা বিএনপির কিছু নেতাও জড়িত।
অন্যদিকে গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাঙামাটি জেলা তাঁতি দলের একটি কমিটি ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। একাংশের দাবি, ওই কমিটি জালিয়াতির মাধ্যমে গঠন করা হয়েছে। পরদিন জেলা বিএনপি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ভুয়া কমিটি দেওয়া হয়েছে। কমিটি বাতিল না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
অপরদিকে ছাত্রদলের কমিটি বাতিল না হলে কঠোর হরতাল-অবরোধের ঘোষণাও দিয়েছে বিক্ষুব্ধ অংশ।
এ পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটতে পারে।
একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, রাঙামাটি জেলা বিএনপির মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে চলছে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং। যার প্রভাব পড়তে থাকে দলের অঙ্গ, সহযোগী সংগঠন ও উপজেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে। দুই থেকে তিনটি ধারায় বিভক্ত রাঙামাটি বিএনপির গ্রুপিং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে দুটি ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্য ও পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে ঘিরে একটি বলয় গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ মামুনকে ঘিরেও আরেকটি বলয় সক্রিয় রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সমর্থিত বলয় মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে। অপরদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ান দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর তার অনুসারীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সরকার গঠনের পর মাঠ পর্যায়ে এই গ্রুপের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।
দলের শীর্ষ পর্যায়ের এই মতবিরোধ ও গ্রুপিংয়ের প্রভাব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও ব্যাপকভাবে পড়েছে। এর ফলে ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, তাঁতি দল ও শ্রমিক দলের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায়ও দুই পক্ষের অনুসারীরা বিভক্ত হয়ে রয়েছে। বাঘাইছড়ি ও কাপ্তাই উপজেলায় এ কোন্দলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।
শীর্ষ পর্যায়ের গ্রুপিংয়ের কারণে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, জেলার শীর্ষ নেতারা নিজেদের স্বার্থে গ্রুপিং রাজনীতিতে বেশি ব্যস্ত।
এদিকে জেলা বিএনপিতে বিরাজমান এই দুই ধারার বাইরেও চট্টগ্রামের হাটহাজারী আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের কিছু অনুসারী রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ কর্মী সমর্থকরা।
এদিকে জেলা বিএনপির এই দুই ধারার বাইরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালেরও কিছু অনুসারী রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা।
অন্যদিকে, সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি নিয়ে বিরোধ নিরসনে সিনিয়র নেতাদের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে তৃণমূল কর্মীরা অভিযোগ করেছেন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ মামুন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অঙ্গসংগঠনের কমিটি সংক্রান্ত বিরোধে জেলা কমিটির সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ছাত্রদল ও তাঁতি দলের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, জেলা বিএনপিতে কোনো গ্রুপিং নেই এবং তাঁর সঙ্গে সংসদ সদস্য ও পার্বত্য মন্ত্রীর কোনো বিরোধও নেই।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো বলেন, ছাত্রদলের যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়নি। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত ছিল জেলা পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করে কমিটি ঘোষণা করা।
রাঙামাটি জেলা তাঁতি দলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার আজিম অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সদস্য সচিবের স্বাক্ষর জাল করে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক জেলা তাঁতি দলের কমিটি ঘোষণা করেছেন। একইভাবে জেলা তাঁতি দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছগির আহমেদও দাবি করেন, জালিয়াতির মাধ্যমে একটি ভুয়া কমিটি গঠন করা হয়েছে।






