ক্যাম্পাস

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে বাস্তব চিত্র: ১২ ঘণ্টার শ্রমে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

মোহন খোন্দকার, জবি প্রতিনিধি

শেয়ারঃ

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে বাস্তব চিত্র: ১২ ঘণ্টার শ্রমে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব- খবরের থাম্বনেইল ফটো

শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখা, শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা এবং শিশুশ্রম বন্ধে বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিবছর ১২ জুন বিশ্বজুড়ে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস (ওয়াল্ড ডেই এগিনেস্ট চাইল্ড লেবার) পালিত হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সালে প্রথম এই দিবসটি চালু করে। তবুও বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যে শিশু এখন পড়ালেখা করবে সে এখন কাজ করছে বই তৈরির দোকানে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে।


আইএলও, ইউনিসেফ এর তথ্য অনুসারে, বিশ্বে ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু এখনো শিশুশ্রমে যুক্ত, বাংলাদেশে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সংকট রয়ে গেছে। ২০১৩ সালে যেখানে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৭ শতাংশে (প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু)। কিন্তু একই সময়ে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শ্রমে যুক্ত থাকার সামগ্রিক হার ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে। ক্ষতিকর কাজে যুক্ত বৃহত্তর শিশুশ্রমের হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে—২০১৩ সালে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে ২০২২ সালে। যা প্রকাশ করে শিশুরা এখনো বঞ্চিত তাদের মৌলিক অধিকারগুলো থেকে।


পুরান ঢাকার একটি বই তৈরীর কারখানায় ডাইস মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছে ১২ বছর বয়সী সিফাত। বয়সে শিশু হলেও গত এক বছর ধরে সে বই কাটিংয়ের কাজ করছে তিনি। সিফাত জানান, "তার মাসিক বেতন ৫ হাজার টাকা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয় তাকে।" পড়াশোনার বিষয়ে জানতে চাইলে সিফাত বলে, "সে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। এরপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি।" তার ভাষ্য, পড়াশোনা ভালো লাগত না বলেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। কারখানায় তার দায়িত্ব ডাইস মেশিন পরিচালনা করা। এই মেশিন দিয়ে বই মাপ করে কাটার কাজ করা হয়। ভারী চাকাযুক্ত মেশিনটি ঘুরিয়ে কাজ করতে কষ্ট হয় কি না জানতে চাইলে সিফাত সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়, “কষ্ট হয়।”


নাম জানাতে অনিচ্ছুক আরেক শিশু শ্রমিক বলেন, ​"আইছি, পড়াশোনা করতে না পাইরা ভাইয়ার সাথে এইখানে আইছি। কাজ করি মাসে বেতন দেয় ৫ হাজার টাকা। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করি।"


মানিকগঞ্জ থেকে পুরান ঢাকার আরেক বই তৈরীর কারখানায় কাজ করেন শিশু রাহাত। তাকে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, "পড়ালেখা ভালো লাগে না, তাই এখানে কাজ করি। পড়ালেখায় মন নাই। পড়ালেখা মনে টানে না, এজন্য কাজে আইছি দুই বছর। সকাল ৮টা থেকে শুরু করে ১২টা ডিউটি।"


মানিকগঞ্জ থেকে কাজ করতে আসা নাম জানাতে অনিচ্ছুক আরেক শিশু জানায়, "তিন বছর ধরে কাজ করছি। পড়াশোনা ভালো লাগে না তাই কাজ করি। পরিবারে কোনো সমস্যা নেই। কাজ করি বাড়িতে টাকা পাঠাই।"


শিশু বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, শিশুশ্রম শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশের পথে অন্যতম প্রধান বাঁধা। তারা মনে করেন, শিশুশ্রম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং এটি শিশুদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। শ্রমে নিয়োজিত থাকার কারণে অনেক শিশু শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সম্ভাবনার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ জীবন, কর্মসংস্থান এবং সমাজে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান গড়ে তোলার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


এ সম্পর্কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. ফারহানা জামান বলেন, "শিশুশ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্য। অনেক পরিবার আর্থিক সংকটের কারণে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়। আমাদের দেশে শিক্ষার ব্যয় এখনও অনেক পরিবারের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি, ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো শিশুদের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হিমশিম খায়। এছাড়া নিয়োগকর্তারাও অনেক সময় শিশুদের কাজে নিতে আগ্রহী হন, কারণ প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের তুলনায় শিশুদের কম মজুরি দিলেই কাজ করানো যায়।"


শিশুশ্রম নিরসন সম্পর্কে বলেন, "শিশুশ্রম নিরসনে বিদ্যমান আইন আরও শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমানে আইনের কিছু দুর্বলতা ও প্রয়োগগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা দূর করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ, নির্যাতন বা শোষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও বেশি করে নিতে হবে। শিশুশ্রম একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে কার্যকর আইন প্রয়োগ, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে নির্মূল করা সম্ভব।


সম্পর্কিত খবর