ক্যাম্পাস

সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের জীবনে আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ

মোহন খোন্দকার, জবি

শেয়ারঃ

সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের জীবনে আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ- খবরের থাম্বনেইল ফটো

‎বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ, জ্ঞান অর্জন, বিনোদন কিংবা নিজের মতামত প্রকাশ সবক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব স্পষ্ট। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষা ও তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা নেতিবাচক প্রভাবও। কারও কাছে এটি আশীর্বাদ, আবার কারও কাছে এটি ধীরে ধীরে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।


‎বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও বিশ্ব সম্পর্কে জানার সুযোগ বাড়ালেও অতিরিক্ত ব্যবহার তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছেন সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার সম্পর্কিত তাদের নিজস্ব মতামত ও অভিজ্ঞতা।

মাইমুন নাহার তিষা শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা হলেও বর্তমানে এটি প্রায় আমাদের অভিশাপের হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এখানে দোষটা কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার না; বরং তা শিক্ষার্থীদের ভুল ব্যবহারের ফলাফল। এই যুগে আমরা শিক্ষার্থীরা যেখানেই যাই না কেন, শেখার আগে যেকোনো কিছুই আমাদের চিন্তায় থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার। দুঃখজনক হলেও সত্য, শিক্ষার্থীরা এতোটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত যে তারা মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মাথা উঠাতেই নারাজ, যা অপার সম্ভাবনাময় বিশ্ব গঠনে বাধা হিসেবে চিহ্নিত।”

‎আব্দুল ওয়াদুদ শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের জীবনে আশীর্বাদ ও অভিশাপ উভয়ই হতে পারে; যা সম্পূর্ণ নির্ভর করে এর ব্যবহারের ওপর। একজন শিক্ষার্থী সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই নতুন বিষয় শিখতে, জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে এবং সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে আপডেট থাকতে পারে। অন্যদিকে, এর অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং মূল্যবান সময়ের অপচয় করে। তাই সদ্ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রিত অভ্যাসই শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে উপকারী।”

‎মোঃ নাবিদ হাসান শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“সোশ্যাল মিডিয়া আধুনিক যুগে শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞান ও যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে তারা সহজেই শিক্ষামূলক তথ্য, গবেষণা ও অনলাইন কোর্সের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে জ্ঞানচর্চা আরও বিস্তৃত ও সহজ হয়েছে। তবে অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের সময়ের অপচয়, আসক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। অনেক সময় তারা পড়াশোনার চেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিনোদনে বেশি সময় ব্যয় করে, যা চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই সচেতন ও পরিমিত ব্যবহারে সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ, আর অপব্যবহারে তা অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে।”

‎ফারজানা ফেরদৌস শৈলী শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ ও অভিশাপ—উভয়ই যেন দ্বিধারী তলোয়ার। এটি একদিকে যেমন জ্ঞান, সংযোগ ও সৃজনশীলতার দরজা খোলে, আবার অন্যদিকে আসক্তি, মনোযোগ বিচ্যুতি এবং মানসিক চাপ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। সঠিক ব্যবহারে এটি শক্তিশালী হাতিয়ার, আর অসচেতন ব্যবহারে বিপদের কারণ। সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীর নিজের হাতে।”

‎মিফতাহুল জান্নাত মৌমিতা শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“বিতর্কিত এই বিষয়টি সম্পূর্ণ এর ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। NCBI এবং DataReportal-এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। যার মধ্যে ১৮-২৯ বছর বয়সী ৮৮-৯৫ শতাংশ তরুণ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। এটি শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস, ই-বুক ও শিক্ষামূলক তথ্য সহজে পেতে সাহায্য করে। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার বৃদ্ধি করে মানসিক চাপ, সময়ের অপচয় এবং মনোযোগের ঘাটতি। তাই সচেতন, দায়িত্বশীল এবং পরিমিত ব্যবহারই সর্বোত্তম।”

‎মোছা: রাতিয়া খাতুন শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। আর এই যুগের এক জাদুকরী উপহার সোশ্যাল মিডিয়া। যা শিক্ষার্থীদের জীবনে যেন এক জাদুকরী আলো। এটি একদিকে যেমন ঘরে বসেই বিশ্বকে জানার অপার আশীর্বাদ, অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগতের এই মোহ ও অতিরিক্ত আসক্তি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের এক নীরব অভিশাপ। ২০২৫ সালের এক জরিপে ৪৫% শিক্ষার্থী স্বীকার করেছে যে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে। তাই প্রযুক্তির এই চমৎকার হাতিয়ারটিকে বর্জন নয়, বরং সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমেই জীবনের আসল সাফল্য আনা সম্ভব।”

‎মাশরিফা মিশকাত শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই যেকোনো তথ্য জানা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শিক্ষার্থীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপ শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষা ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ‎এর ইতিবাচক দিক রয়েছে অনেক। করোনাকালে অনলাইন ক্লাস ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। বর্তমানে ভর্তি, চাকরি ও বৃত্তির তথ্যও সহজে পাওয়া যায়। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন অনলাইনে শেখার সুযোগ পাচ্ছে। তবে নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যবহার পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে এবং সময় নষ্ট করছে। পাশাপাশি সাইবার বুলিং, গুজব ও প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারে শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। সবশেষে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এটি ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। সচেতনভাবে ব্যবহার করলে এটি আশীর্বাদ, আর অপব্যবহার করলে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে।”

‎মোঃ কামরুল হাসান শিক্ষার্থী, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-

‎“ইন্টারন্যাশনালাইজেশন ও গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে প্রজন্মের মাঝে সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভরতা প্রকট। এটি হয়ে উঠেছে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম, অনেকক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু অতি নির্ভরতা ও ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করছে দিনদিন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া এখন আশীর্বাদ নয়, রীতিমতো অভিশাপ। তরুণ থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সবাই এখানে বুঁদ হয়ে থাকে। মনোযোগ আকর্ষণের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ঘটে না, বিভ্রান্তি ও দৃষ্টিভ্রমের এ যাদুর জগতে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এমতাবস্থায়, সোশ্যাল মিডিয়ার পরিমিত ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে এটি আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।”


সম্পর্কিত খবর