সারাদেশ

মেহেরপুরে সরকারি ধান বিক্রিতে বিএনপি-জামায়াতের ‘টোকেন’ অভিযোগ

মেহেরপুর প্রতিনিধি

শেয়ারঃ

মেহেরপুরে সরকারি ধান বিক্রিতে বিএনপি-জামায়াতের ‘টোকেন’ অভিযোগ- খবরের থাম্বনেইল ফটো

মেহেরপুরে চলতি মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেও প্রান্তিক চাষিরা সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, গুদামে ধান দিতে গেলে কর্তৃপক্ষ তাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে স্লিপ বা টোকেন নিয়ে আসতে বলছে। এতে হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষক সরকারের নির্ধারিত দামে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মেহেরপুর সদর উপজেলায় কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ৭৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির দুটি গ্রুপ ও জামায়াতের নেতাদের মাধ্যমে নির্ধারিত স্লিপ ছাড়া কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে যেসব কৃষক রাজনৈতিকভাবে অনুমোদিত স্লিপ পেয়েছেন, কেবল তারাই ধান দিতে পারছেন; অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন।


বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির দুটি গ্রুপ ৬০ শতাংশ এবং জামায়াত ৪০ শতাংশ কোটা অনুযায়ী ধান সরবরাহ করছে—এমন একটি সমঝোতা তাদের মধ্যে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


মেহেরপুর পৌর এলাকার কালাচাঁদপুর গ্রামের ১৭ জন কৃষক ধান বিক্রির জন্য খাদ্যগুদামে গেলে তাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে স্লিপ নিয়ে আসতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন ওই গ্রামের কৃষক শান্ত।


তিনি বলেন, “প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ধান বিক্রির জন্য আমরা কয়েকজন কৃষক খাদ্যগুদামে আবেদন করি এবং কৃষি কর্মকর্তার প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করি। গত ১৩ মে প্রত্যয়নপত্র পেলেও এখন পর্যন্ত ধান বিক্রি করতে পারিনি। গুদামে গেলে ওসি এলএসডি মাসুদ রানা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে স্লিপ নিয়ে আসতে বলেন।”


শান্ত আরও বলেন, “আমি চার বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে প্রায় চার টন ধান বিক্রি করতে পারব। কিন্তু এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি চলতে থাকলে প্রান্তিক কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এর প্রতিকার হওয়া উচিত।”


তবে একই এলাকার কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি বিএনপির একটি গ্রুপের মাধ্যমে তিন টন ধান বিক্রি করতে পেরেছেন। তবে তিনি বলেন, “আমি ধান দিতে পারলেও অনেক কৃষক এখনও গুদামে ধান দিতে পারেননি।”


এ বিষয়ে সদর উপজেলার খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) মাসুদ রানা বলেন, “আমরা কৃষকদের কাছ থেকেও ধান কিনছি।” অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি হুকুমের গোলাম। এর বেশি কী করার আছে আমার?”


খাদ্যগুদামের সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মেহেরপুরে বিএনপির দুটি গ্রুপ ও জামায়াতের সমন্বয়ে স্লিপ বিতরণ করা হচ্ছে এবং তারা নিজেদের পছন্দের কৃষকদের এসব স্লিপ দিচ্ছেন।


সদর উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এরশাদ আলী বলেন, “প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকেও ধান সংগ্রহ করতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে অন্য কারও কাছ থেকে ধান নেওয়ার সুযোগ নেই।”


সদর উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাবলু সূত্রধর বলেন, “প্রান্তিক কৃষকরা যাতে ধান বিক্রি করতে পারেন, সে লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। কোনো কৃষক ধান দিতে না পারলে অভিযোগ করলে তার ধান বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে।” তবে রাজনৈতিক নেতাদের স্লিপের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।


উল্লেখ্য, গত ৩ মে থেকে সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, যা চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এ বছর মেহেরপুর সদর উপজেলায় ৭৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৪ জুন পর্যন্ত সদর খাদ্যগুদামে ১১৪ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


সম্পর্কিত খবর